মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে হামের উপসর্গে দুই ছেলেকে হারিয়েছেন বান্দরবানের রুমা উপজেলার বাসিন্দা নাংয়ো খুমি (৩৫)। বড় ছেলে খ্রেতং খুমি (৬) গত শুক্রবার এবং ছোট ছেলে প্রেলং খুমি (৪) সোমবার মারা যায়। পরপর দুই সন্তানকে হারিয়ে শোকাহত ও দিশাহারা হয়ে পড়েছেন এই খুমি মা।
নাংয়ো খুমির বাড়ি রুমা সদর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দুর্গম লেটংপাড়ায়। সেখান থেকে সড়কপথে পৌঁছাতে প্রায় ৯ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ হেঁটে যেতে হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রায় এক সপ্তাহ আগে বড় ছেলে খ্রেতংয়ের জ্বর, শ্বাসকষ্টসহ হামের উপসর্গ দেখা দেয়। দুর্গম এলাকার অনেক পরিবারের মতো নাংয়ো খুমির পরিবারও তাকে হাসপাতালে না নিয়ে বাড়িতেই চিকিৎসা দেয়। শুক্রবার সকালে তার মৃত্যু হয়।
এরই মধ্যে ছোট ছেলে প্রেলংও একই ধরনের উপসর্গে আক্রান্ত হয়। বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পরদিন শনিবার তাকে বান্দরবান সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা রোববার রাতেই তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে অর্থসংকট এবং সঙ্গে যাওয়ার মতো লোক না থাকায় সেদিন তাকে নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরদিন হাসপাতালে নেওয়ার পর বিকেল ৫টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
বান্দরবান সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ তৌহিদুল আনোয়ার জানান, প্রেলং খুমির হামের উপসর্গের পাশাপাশি তীব্র শ্বাসকষ্ট ছিল এবং তার জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউ চিকিৎসা প্রয়োজন ছিল। সে কারণেই দ্রুত চট্টগ্রামে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
এদিকে রুমা ও থানচি উপজেলার দুর্গম এলাকাগুলোতে নতুন করে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, চলতি মাসে রুমা উপজেলায় হামের উপসর্গে অন্তত আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ এখন পর্যন্ত তিন শিশুর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে। তাদের তথ্যমতে, বর্তমানে বান্দরবান সদর হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ৪২ শিশু চিকিৎসাধীন।
স্বাস্থ্যকর্মী ও স্থানীয়দের ভাষ্য, দুর্গম এলাকার অনেক মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে অনাগ্রহী। হাসপাতালের নিয়মকানুন সম্পর্কে সীমিত ধারণা, আর্থিক সংকট এবং সঙ্গে পরিচিত কাউকে না পাওয়ার কারণে অনেক পরিবার সময়মতো হাসপাতালে আসে না। ফলে অনেক শিশুর চিকিৎসা বিলম্বিত হচ্ছে।
লেটংপাড়ার কার্বারি (পাড়াপ্রধান) শৈলুং খুমি জানান, তাদের ২৬ পরিবারের পাড়ায় শুধু শুক্র ও শনিবারই হামের উপসর্গে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর আগে একই পাড়ায় আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছিল।
রুমা সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অংসিংনু মারমা এবং গালেঙ্গ্যা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেনরত ম্রো বলেন, চলতি মাসে তাদের দুই ইউনিয়নে হামের উপসর্গে আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। দুর্গম পাড়াগুলোতে আরও অনেক শিশু আক্রান্ত রয়েছে।
রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. হাসান জানান, হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সমন্বয় সভা হয়েছে। সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বয়ে বিশেষ টিকাদান অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মৌখিক ময়নাতদন্তের মাধ্যমে হাসপাতালের বাইরে তিন শিশুর মৃত্যুর তথ্যও পাওয়া গেছে।
বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শাহিন হোসাইন চৌধুরী বলেন, পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হওয়ায় সোমবার থেকে সপ্তাহব্যাপী বিশেষ টিকাদান অভিযান শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা যৌথভাবে দুর্গম এলাকায় গিয়ে টিকাবঞ্চিত শিশুদের শনাক্ত করে টিকা দিচ্ছে।