কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে বা অপরাধী গ্রেপ্তারের পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওই অপরাধের খলনায়ক বা ঘটনায় জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তারদেরকে শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের ‘সহযোগী’ বলে দাবি করা হচ্ছে। প্রশাসনের এমন আচরণের সুযোগে একদিকে অন্য অপরাধীরা আড়ালে থেকে যাচ্ছে। আবার কেউ নিজের অপরাধ ঢাকার জন্য ডেভিড ইমনকে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করার শঙ্কা সৃষ্টি হচ্ছে। এই নিয়ে সচেতন মহল তো বটেই, আত্মপক্ষ সমর্থন করে খোদ ডেভিড ইমনও উষ্মা প্রকাশ করেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে ঘটে যাওয়া কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলা নিয়ে ছড়ানো প্রপাগাণ্ডার বিষয়ে অডিও বার্তা ছেড়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রীতিমত ভাইরাল হওয়া এসব অডিও বার্তায় তিনি ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত নন এবং ঘটনাকে ভিন্ন মুখোশ পড়াতে তার নাম ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগও তুলেছেন।
ডেভিড ইমনের অডিও বার্তা প্রকাশের পর সমাজ সচেতন মহলে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
ঘটনা-১ :
গত ১১ জুলাই চকবাজার চন্দনপুরা এলাকায় ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ডিডিএন’র স্বত্বাধিকারীকে হোয়াটসঅ্যাপে কল করে নিজেকে ‘ডেভিড ইমন’ পরিচয় দিয়ে এককালীন দুই কোটি টাকা এবং পরে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৩ জুলাই দুপুরে ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি সশস্ত্র দল হামলা চালায়। এসময় ভাঙচুর করে অন্তত ১৫ লাখ টাকার ক্ষতিসহ কোম্পানির পরিচালকের কাছ থেকে ৩৫ লাখ টাকা লুট করা হয় বলে অভিযোগ উঠে।
এ ঘটনার ব্যাপারে র্যাব-৭ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ডিডিএন নামে প্রতিষ্ঠানে ডেভিড ইমনের নির্দেশে হামলা করা হয়। ডেভিড ইমন সম্পর্কে আমাদের কাছে তথ্য নেই এমন নয়। আমাদের কাছে ধারণা আছে। তবে গ্রেফতারের আগপর্যন্ত প্রকাশ্যে বলা ঠিক হবে না। আমরা তাকে গ্রেফতারের খুব কাছাকাছি আছি। এই ঘটনায় পুলিশ ও র্যাবের অভিযানে এই পর্যন্ত ২১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ডেভিড ইমনের অস্বীকার বার্তা :
ডিডিএন প্রতিষ্ঠানে হামলায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ নিয়ে সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন একটি অডিও বার্তা প্রকাশ করেছেন। ভাইরাল হওয়া অডিও বার্তায় ডেভিড ইমন বলেন, ঘটনাটা সম্পূর্ন একটা সাজানো নাটক। এটা অতি অল্প বাজেটের একটা বাংলা সিনেমা। গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে খবর পৌঁছাতেও তো সময় লাগে। কিন্তু এটা সময় লাগে নাই। এটা আগে থেকে সবকিছু সেটআপ করে রাখছে। ঘটনার আধঘণ্টার মধ্যে মিডিয়ায় নিউজ শুরু করেছে। ওই ঘটনায় হামলাকারীরা কারো গায়ে হাত তুলে নাই। হামলাকারীরা আরও স্টাফদেরকে ভিতর থেকে বাইরে করে দিচ্ছে। কয়েকটা ল্যাপটপ ভাঙচুর করেছে।
ডিডিএন’র মালিককে নিয়ে ডেভিড ইমনকে বলতে শোনা যায়, সে হচ্ছে একজন অর্থ পাচারকারী। এস আলমের অনেক টাকা সে সিঙ্গাপুরে পাচার করেছে। আওয়ামী লীগের নেতা মহিউদ্দিন বাচ্চুর সে ব্যবসায়িক পার্টনার। গত ১৭/১৮ বছর ধরে সে কাউকে শান্তিতে ব্যবসা করতে দেয় নাই। অতীতের অপকর্ম ঢাকার জন্য সে এসব ঘটনা সাজিয়েছে। সে আওয়ামী লীগের হয়ে বর্তমান সরকারকে বিভ্রান্ত করার জন্য অতি অল্প বাজেটের বাংলা সিনেমা দেখিয়েছে। হাতুড়ি আর লাঠি দিয়ে ভাংচুর করা আমাদের কাজ না। সে এআই দিয়ে কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করে চাঁদা দাবি,হুমকি এসব নাটক সাজিয়েছে। আমরা এখনো শুরু করিনি। বাধ্য করলে শুরু করব। আমরা যেটা করব সেটা বাংলা সিনেমা হবে না। ইনশাল্লাহ।
ঘটনা-২ :
২০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে গত ২৬ জুলাই চট্টগ্রামের ১ নং দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ড বড় দীঘিরপাড়-ভাটিয়ারি লিংক রোড সংলগ্ন আবাসিক এলাকায় নির্মাণাধীন একটি ভবনে ককটেল বিস্ফোরণ ও ভাঙচুর চালায় সন্ত্রাসীরা। ওই ভবনের মালিক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনকে সন্ত্রাসীরা হুমকি দিয়ে বলেন যে, ‘২০ লাখ টাকা চাঁদা না দিলে ১০০ জন পুলিশের সামনেও গুলি করা হবে।’
গতকাল ভুক্তভোগী হাটহাজারী থানায় মামলা করেছিলেন। তবে ফল হয়েছে উল্টে। সন্ত্রাসীরা প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে এখন ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছে তার কাছ থেকে।
তবে প্রশাসনও নিশ্চুপ নয়। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে মোহাম্মদ আসিফ, সাইদুল ইসলাম আরিফ ও মোহাম্মদ তালহা নামে তিন জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃৃঙ্খলা বাহিনী। এদের মধ্যে আসিফ ও তালহাকে ডেভিড ইমনের সহযোগী হিসেবে দাবি করেছে পুলিশ।
বায়েজিদ বোস্তামি থানার ওসি মোহাম্মদ আবদুল করিম জানালেন, গ্রেপ্তার আসিফ নিজেকে ডেভিড ইমনের সহযোগী বলে দাবি করেছে। পরে আমরা হাটহাজারীর ঘটনার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ যাচাই করে হামলার সময় তার উপস্থিতি শনাক্ত করি। আসিফ পুলিশের ওপর হামলা, চাঁদাবাজিসহ ১১ মামলার আসামি। আরিফের বিরুদ্ধেও দুটি মামলা আছে।
চট্টগ্রাম শহরে শুধু কি আমিই আছি (ডেভিড ইমন) ?
বড় দিঘীর পাড় আবাসিক এলাকার নির্মাণাধীন ভবনে হামলার ঘটনা নিয়ে অডিও বার্তায় ডেভিড ইমন বলেন, চট্টগ্রাম শহরে শুধু কি আমিই আছি ? আমি ছাড়া আর কেউ নাই। কোনো একটা ছেলে অ্যারেস্ট হলে বলে, ডেভিড ইমনের সহযোগী। কোনো একটা অকারেন্স করলে বলে ডেভিড ইমনের সহযোগীরা করছে। তাহলে দেখতেছি চট্টগ্রাম শহরে আমি ছাড়া আর কেউ নাই। বা থাকলেও তাদেরকে মিডিয়া ও প্রশাসনরা দেখে না। দেখেও না দেখার মত করছে।
বার্তায় তাকে আরও বলতে শোনা যায়, বায়েজিদ থানায় অস্ত্রসহ আসিফ নামে যে ছেলেটি অ্যারেস্ট হইছে মিডিয়া ও প্রশাসন তাকে ডেভিড ইমনের সহযোগী বলে ট্যাগ লাগাই দিয়েছে। অথচ আমি একে জীবনে দেখিও নাই। চিনিও না।
‘‘কয়েকদিন আগে বিদেশি পিস্তলসহ সরোয়ার বাবলার ভাইকে বাসা থেকে র্যাব ধরছিল। কিন্তু পরে শুনলাম র্যাব অস্ত্রটাকে পরিত্যক্ত দেখাইছে। বলছে বাসার বাইরে থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় অস্ত্রটি পাওয়া গেছে। কারণ র্যাবে এসপি সাইফুল ইসলামের সাথে সরোয়ার বাবলার সাথে একটা ভাল সম্পর্ক ছিল। ওই সম্পর্কের কারণে সাইফুল ইসলামে সরোয়ার বাবলার ভাইকে অস্ত্র দিয়ে চালান দেয় নাই। অস্ত্রটি পরিত্যক্ত দেখাইছে। এরা অপরাধ করেও অপরাধী নয়। আর কোনো একটা নিরীহ ছেলে অ্যারেস্ট হইলে তাকে ডেভিড ইমনের সহযোগী বানিয়ে দেয়া হচ্ছে।
’‘তাহলে ঠিক আছে ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তো দেশে আসবে। তখন যদি চট্টগ্রাম শহরে কোনো একটা অরাজকতা সৃষ্টি হয়, তখন দেখি কার সহযোগী বলে ট্যাগ লাগায় ? নাকি তখনো ডেভিড ইমনের সহযোগী বলে নিউজ করবে ?
কে এই ডেভিড ইমন ?
মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন। তার বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগরে। তার বাবার নাম মো. মুসা। সাধারণ কৃষকের ঘরে তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। লেখাপড়াও তেমন করেননি। অল্প বয়সে কিশোর গ্যাং-এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তারপর বড় সাজ্জাদের গ্রুপে যোগ দেন। ফর্সা, সুন্দর শারীরিক সৌন্দর্য সহজেই সবার নজর কাড়েন তিনি। একের পর এক অকারেন্স পারফরমেন্সে সহজেই তিনি নেতার (বড় সাজ্জাদ) নজরে চলে আসেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বড় সাজ্জাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড ছোট সাজ্জাদের গ্রেপ্তার পরবর্তী ডেভিড ইমন ও রায়হান আলম গ্রুপে সেকেন্ড ইন কমান্ডের দায়িত্ব পালন করছেন। ডেভিড ইমন চট্টগ্রাম নগর ও রায়হান আলম জেলার দায়িত্ব পালন করছেন। নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, চকবাজার, বাকলিয়া, পতেঙ্গা, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, আনোয়ারা ও হাটহাজারী উপজেলায় এই গ্রুপের প্রভাব বেশি। এই দলে আরও রয়েছেন খোরশেদ, ভাতিজা মোহাম্মদ, নাজিম উদ্দিন, ববি আলম, কামাল, হাসান, নুরুল হক, বোরহান, মবিন, কাদের, তপু, আজম, মনির, তুষার, তুহিন, সোহেল, ছালেক ও এরশাদ—যাদের অধিকাংশই অস্ত্র চালনায় বিশেষ দক্ষ। দলটিকে বিদেশ থেকে ফোনে নিয়মিত নির্দেশনা পাঠান সাজ্জাদ।
পূর্বতারা