ভয়াবহ বন্যায় চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের সাতকানিয়া, বাঁশখালী ও চন্দনাইশ উপজেলায় নিরাপদ পানীয় জলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) তথ্য অনুযায়ী, এ তিন উপজেলায় প্রায় ২০ হাজার নলকূপ এবং ৫ হাজার ৬৯৪টি টয়লেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৮ লাখ মানুষ বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়েছেন।
ডিপিএইচই জানায়, তিন উপজেলায় মোট ১৯ হাজার ৯৬১টি নলকূপ সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১২ হাজার ১১০টি সম্পূর্ণ এবং ৭ হাজার ৮৫১টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত। সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন উভয় ধরনের নলকূপই বন্যার পানিতে অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
সাতকানিয়া উপজেলায় ৭ হাজার ১২৭টি নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ১৫টি সম্পূর্ণ এবং ২ হাজার ১১২টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত। একই সঙ্গে উপজেলার ২ হাজার ১৫৬টি টয়লেট নষ্ট হয়েছে। বাঁশখালী উপজেলায় ৮ হাজার ২৬টি নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৫২৩টি সম্পূর্ণ এবং ৩ হাজার ৫০৩টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত। পাশাপাশি ২ হাজার ৪২৭টি টয়লেটও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চন্দনাইশ উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪ হাজার ৮০৮টি নলকূপ। এর মধ্যে ২ হাজার ৫৭২টি সম্পূর্ণ এবং ২ হাজার ২৩৬টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত। এ উপজেলায় ১ হাজার ৬৬টি টয়লেট নষ্ট হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বন্যার পানি নেমে গেলেও অধিকাংশ নলকূপ থেকে এখনও ঘোলা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি উঠছে। ফলে অনেক পরিবার দূর-দূরান্ত থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছে।
সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া গ্রামের বাসিন্দা সিদ্দিক আহমেদ বলেন, দুই দিন ধরে আমার ছোট মেয়ে ডায়রিয়ায় ভুগছে, আর স্ত্রী চর্মরোগে আক্রান্ত। বিশুদ্ধ পানির অভাবেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বাঁশখালীর কোকদণ্ডী গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ রফিক বলেন, আমাদের গ্রামের প্রায় সব নলকূপই দূষিত হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে অনেকে অনিরাপদ পানি পান করছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপ দ্রুত জীবাণুমুক্ত ও মেরামত করে নিরাপদ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয়, টাইফয়েড ও চর্মরোগের প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। তাই বন্যাদুর্গত মানুষকে পানি ফুটিয়ে বা বিশুদ্ধ করে পান করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাস বলেন, ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরি করে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপ পুনঃস্থাপন, আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপ মেরামত এবং দুর্গত এলাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাজ চলছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবদুর রব বলেন, বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষকে অবশ্যই পানি ফুটিয়ে বা বিশুদ্ধ করে পান করতে হবে। ভালোভাবে হাত ধুতে হবে। সাপে কামড় দিলে বা পানিবাহিত রোগের লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে হাসপাতালে যেতে হবে। এ সময়ে এসে শিশু, বৃদ্ধ ও অন্তঃসত্ত্বাদের যেন অযত্ন না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বন্যার পর পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই বিভিন্ন উপজেলায় মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করা হচ্ছে। রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসার পাশাপাশি ওষুধ, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. ফজলে রাব্বি বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগ প্রস্তুত আছে। আমাদের মেডিকেল টিমগুলো মাঠে সক্রিয় আছে। আগেই প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত করেছিলাম। এখন পর্যন্ত ৫০ হাজারের বেশি পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে এবং যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত স্যালাইন ও ওষুধের মজুত রয়েছে।