চট্টগ্রাম বন্দর ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সার্ভার হ্যাক করে জালিয়াতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার বিদেশি মদ ও সিগারেটের চালান খালাসের চেষ্টার অভিযোগে এক হ্যাকারকে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। গ্রেপ্তারকৃত যুবকের নাম শেখ সেজান (২৬)।
গত ১৫ জুলাই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে নেপাল পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করার সময় ইমিগ্রেশন পুলিশের সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
শুক্রবার (১৯ জুলাই) চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) মুহাম্মদ ফয়সাল আহমেদ এই তথ্য জানান।
পুলিশ জানায়, মিথ্যা ঘোষণায় এবং শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ১১ হাজার ৬৭৬ লিটার বিদেশি মদ ও ৫০ লাখ শলাকা বিদেশি সিগারেট খালাসের চেষ্টার ঘটনায় বন্দর থানায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। সেই মামলার তদন্তে সেজানের সম্পৃক্ততা পায় পুলিশ। পাচারকারী চক্রটি চীন থেকে ‘ডিউটি ফ্রি বন্ডেড ফেব্রিক’ ঘোষণার মাধ্যমে এসব মদ ও সিগারেট আমদানি করেছিল, যার মাধ্যমে সরকারের প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির পরিকল্পনা ছিল।
কিভাবে চলত সার্ভার হ্যাকিং
তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এনবিআরের শুল্কায়ন প্রক্রিয়া ‘অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম’ এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অনলাইন পোর্টালে অবৈধভাবে প্রবেশ করে সেজান ওই সিন্ডিকেটকে কারিগরি সহায়তা দিতেন।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সেজান স্বীকার করেছেন যে, তিনি তার তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞান ব্যবহার করে শুল্ক কর্মকর্তাদের ইউজার আইডি ব্যবহার করে সিস্টেমে প্রবেশ করতেন এবং পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করে অবৈধ পণ্য খালাস নিশ্চিত করতেন। এর আগে গ্রেপ্তার হওয়া আশরাফ হোসেন রাজু নামের অন্য এক আসামির আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতেও সেজানের নাম উঠে এসেছে।
ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ২০ মে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করে এক কাস্টমস কর্মকর্তার আইডি দিয়ে অননুমোদিতভাবে সিস্টেমে লগ-ইন করা হয়। পরবর্তীতে একই আইডি ব্যবহার করে সিগারেট চোরাচালান সংক্রান্ত এলসি রেজিস্ট্রেশন ও অ্যাক্টিভেশনের কাজ সম্পন্ন করা হয়।
এর আগে নড়াইলের লোহাগড়ায় সেজানের বাড়িতে অভিযান চালালেও তিনি পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তবে সেখান থেকে একটি স্যামসাং মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়, যা দিয়ে তিনি অ্যাসাইকুডা সিস্টেমে প্রবেশ করতেন বলে পুলিশ দাবি করেছে।
ভয়ঙ্কর সাইবার টেকনিশিয়ান আসামি সেজান
অতিরিক্ত কমিশনার ফয়সাল আহমেদ জানান, সেজান একজন পেশাদার সাইবার অপরাধী। এর আগে সরকারি ওয়েবসাইট ক্লোন করে ভুয়া এনআইডি কার্ড, জন্মনিবন্ধন সনদ, ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ এবং কোভিড-১৯ টিকাদান সনদ তৈরির অভিযোগে তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তিনি ও তার সহযোগীরা সরকারি বিভিন্ন সেবার জাল পোর্টাল তৈরি করে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে অর্থ হাতিয়ে নিতেন। তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় অন্তত সাতটি সাইবার অপরাধ ও জালিয়াতির মামলা রয়েছে।
চক্রের আরও সাত সদস্য গ্রেপ্তার
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, এই চোরাচালান সিন্ডিকেটের আরও সাত সদস্যকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন— সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট হাফেজ ট্রেডিং প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান খালেদ হোসেন মামুন ও পরিচালক বাকির হোসেন, প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী খোরশেদ আলম রিপন ও মিজান, এবং সহযোগী আশরাফ হোসেন রাজু, খায়েজ আহমেদ আরিফ ও বড় রাজু। তাদের সবাইকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ২৫০টি কনটেইনার নিখোঁজ হওয়ার সাম্প্রতিক খবর নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ফয়সাল আহমেদ বলেন, এ বিষয়ে পুলিশের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। বিষয়টি কাস্টমস কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখছে।
সার্ভার হ্যাকিং এবং চোরাচালান নেটওয়ার্কের বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পূর্বতারা/ইউডি