,

 

চট্টগ্রামে গ্যাস সংকটে জ্বলছে না চুলা, ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ : 28 July 2026, 05:39

চট্টগ্রামে তীব্র গ্যাস সংকটে জনজীবন ও শিল্পখাত অচলাবস্থার মুখে পড়েছে। আবাসিক এলাকায় দিনের পর দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা গ্যাস না থাকায় রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও গ্যাস পাচ্ছেন না চালকেরা। গ্যাসের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে সার কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে দৈনিক প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২৬০ থেকে ২৭০ মিলিয়ন ঘনফুট। মহেশখালীর বেসরকারি এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির পর থেকে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।

সকাল পেরিয়ে দুপুর, তবুও জ্বলেনি চুলা

নগরের আগ্রাবাদের হাজিপাড়া এলাকার বাসিন্দা আমেনা বেগম জানান, সকালে রান্নার সব প্রস্তুতি থাকলেও সকাল ১০টার দিকে হঠাৎ গ্যাস চলে যায়। এরপর টানা কয়েক ঘণ্টা চুলা জ্বলেনি। বিকেল তিনটার দিকে গ্যাস এলেও চাপ কম থাকায় সঙ্গে সঙ্গে রান্না করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত বিকেলের দিকে রান্না শেষ করে পরিবারের সদস্যরা দুপুরের খাবার খান।

তিনি বলেন, এত দীর্ঘ সময় গ্যাস থাকবে, তা জানলে সকালে রান্না করে রাখতাম। কেউ না খেয়ে ছিল, কেউ বাইরে থেকে খাবার কিনে এনেছে। সকাল থেকে শুধু গ্যাসের অপেক্ষায় ছিলাম।

একই ভবনের ২৪টি পরিবারের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন বাসিন্দাকেও একই দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। অনেকেই হোটেল থেকে খাবার কিনে এনেছেন, আবার কেউ দুপুরের খাবার না খেয়েই অপেক্ষা করেছেন।

আগ্রাবাদের বাসিন্দা রোকেয়া আক্তার বলেন, ছোট শিশুদের জন্য পানি ফোটানো কিংবা সময়মতো খাবার রান্না করা সম্ভব হয়নি। আগে থেকে গ্যাস বন্ধ থাকার তথ্য জানা থাকলে কিছুটা প্রস্তুতি নেওয়া যেত।

হালিশহর ঈদগাহ রঙ্গিপাড়া এলাকার বাসিন্দা আনজুমান আরা জানান, সকাল থেকে চুলা মিটমিট করে জ্বলছিল। বেলা ১১টার পর গ্যাস পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা পর গ্যাস এলে রান্না শুরু করেন। ফলে পরিবারের দুপুরের খাবার খেতে খেতে বিকেল হয়ে যায়।

সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, আয় কমছে চালকদের

গ্যাস সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। নগরের বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নিতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের। কোথাও প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ না থাকায় সীমিত পরিসরে বিক্রি হচ্ছে, আবার কোথাও সাময়িকভাবে সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন স্বাভাবিকভাবে পরিচালনার জন্য অন্তত ১৫ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন। বর্তমানে অনেক এলাকায় গ্যাসচাপ কম। ফলে স্বাভাবিকভাবে গ্যাস বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।

নগরের অক্সিজেন, বহদ্দারহাট, আগ্রাবাদ, চান্দগাঁও, কালুরঘাট, কর্ণফুলী ও অলংকার মোড় এলাকার বিভিন্ন স্টেশনে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে চালকদের। অক্সিজেন এলাকার মুস্তাফিজুর রহমান নামে এক চালক বলেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও ঠিকমতো গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এতে সময় নষ্ট হচ্ছে, আয়ও কমে যাচ্ছে।

কবে কাটবে সংকট?

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) জানিয়েছে, এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে শিল্প, ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আবাসিক—সব খাতেই এর প্রভাব পড়ছে।

কেজিডিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে প্রায় ২৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। আগের দিন সরবরাহ ছিল ২২ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট। অথচ একই সময়ে চাহিদা ছিল প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার মাত্র ৬৪ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ পাওয়া গেছে।

মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের কার্যক্রম পরিচালনাকারী রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) এলএনজি বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. শফিকুল ইসলাম জানান, মার্কিন এক্সিলারেট এলএনজি টার্মিনাল চালু করার জন্য বিশেষজ্ঞ কারিগরি দল কাজ করছে। যেকোনো সময় সমস্যার সমাধান হবে। এরপর পুরোদমে গ্যাস সরবরাহ শুরু হবে।

দেশের চলমান গ্যাস সংকট পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউ মেরামতের কাজ চলছে। তবে মেরামত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এলএনজি কার্গো খালাস সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় রান্নার গ্যাসের চাপ কমে গেছে। পাশাপাশি গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায়ও সমস্যা দেখা দিয়েছে।

ভিডিও