,

 

চট্টগ্রামে সকালে মিষ্টি রোদ, বিকালে বৃষ্টির বাগড়া

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ : 9 July 2026, 04:07

গত চার দিনের একটানা বৃষ্টির পর অবশেষে চট্টগ্রামে রোদের দেখা মিলেছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে থেমে থেমে হালকা বৃষ্টি হলেও দিন বাড়ার সাথে সাথে মেঘের ভিড় এড়িয়ে উঁকি দিয়েছে মিষ্টি রোদ। তবে রোদ-বৃষ্টির এই লুকোচুরি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি বিকাল ৩টার পর আকাশের আবারও মনভার। ভাসা মেঘগুলো জমে গিয়ে ঘন মেঘে রূপ নিতে শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামে আগামী কয়েকদিন আরও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে, বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) থেকে আগামী ১১ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার,বান্দরবান,রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এই সময়ে সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে ২০০ থেকে ৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার উচ্চ ঝুঁকির সতর্কতা দেখিয়েছে সংস্থাটি।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী পূর্বাভাস কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ চৌধুরী জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ২৭১ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় আগামী কয়েকদিন বিক্ষিপ্তভাবে মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। পাশাপাশি পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি থাকায় সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

চট্টগ্রাম মহানগরে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও উপজেলার পরিস্থিতি আগের মতই বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সংবাদ প্রতিনিধিরা।

চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, একটানা প্রবল বর্ষণে চট্টগ্রাম মহানগরীর ৪১ ওয়ার্ডের অধিকাংশ এলাকা জলপ্লাবিত হয়েছে। মোহরা, চান্দগাঁও, শুলকবহর, ষোলশহর, চকবাজার, পাঁচলাইশ, বাকলিয়া, বাগমনিরাম, পতেঙ্গা, কাট্টলী, হালিশহর,গোসাইলডাঙ্গা,পাহাড়তলী ওয়ার্ডের নিম্নাঞ্চল গত দুইদিন ধরে প্লাবিত। সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রধান সড়ক,অলিগলি পানিতে সয়লাব। অধিকাংশ বাড়ির নিচতলা জলের তলে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠান,শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ প্লাবিত হয়েছে।

তবে বুধবার রাত থেকে বৃষ্টি কমায় পানিও কমতে শুরু করেছে। স্থানীয়রা বলছেন, সংশ্লিষ্ট এলাকায় পানি প্রায় এক থেকে দেড় ফুট কমেছে।

চান্দগাঁও পাঠানিয়া গোদা এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ দ্বীন ইসলাম জানান, গত দুই দিন ধরে প্রধান সড়কের মৌলভীপুকুর পাড় থেকে চান্দগাঁও পর্যন্ত হাঁটুর ওপরে পানি ছিল। এলাকার অলিগলিতে দুই ফুটের ওপর পানি ছিল। দোকানপাট,স্কুল,কলেজ সব বন্ধ। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া লোকজন গতকাল বিকালের পর থেকে জোয়ারের কারণে পানির তীব্রতা আরও বাড়তে থাকে। তবে ফজরের পর থেকে পানি কমতে শুরু করে। বৃষ্টি বন্ধ হলে পানি কমে যাবে।

পতেঙ্গা কাঠগড় মুসলিমাবাদের বাসিন্দা ফয়সাল পান্থ বলেন, দুইদিন ধরে আমাদের ভবনের নিচতলায় হাঁটু পানি। আজকে সকালে পানি নামছে। তবে রাস্তায় পানি আছে। পানিবন্দি থাকায় সবখানে স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ। বাসায় জিনিসপত্র সব এলোমেলো। খাওয়া-ধাওয়া, কাপড়-চোপড় ধোয়া নানা কাজকর্ম আটকে রয়েছে।

বৃষ্টি ও আকষ্মিক বন্যায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ও পার্বত্য চট্টগ্রামের জনজীবন স্তব্ধ।

স্থানীয় সংবাদ প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য অনুযায়ী :

বাঁশখালী উপজেলার পুঁইছড়ি, ছনুয়া, শেখেরখীল, চাম্বল, গণ্ডামারা, বাহারচড়া, পূর্ব বৈলছড়ি, খানখানাবাদের প্রমাশিয়া এলাকার অন্তত অর্ধলক্ষাধিক পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এসব এলাকায় পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে মানুষ। হাজার হাজার একর কৃষিজমি,পুকুর, মৎস প্রজেক্ট, চিংড়ি ঘের, বসতভিটা পানিতে ডুবে আছে। বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যাতায়াতে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। বন্ধ রয়েছে মাদ্রাসা, স্কুলসহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

পটিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।চলমান ড্রেন নির্মাণকাজে ধীরগতির কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারছে না। এর ফলে সড়ক, বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান প্লাবিত।

লোহাগাড়ার আমিরাবাদ, কলাউজান,পদুয়া,চুনতি,পুটিভিলা, আধুনগরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা বন্যা কবলিত। এলাকার লাখো মানুষ চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। খাদ্য,চিকিৎসা ও উদ্ধার তৎপরতা সরকারের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

সাংগু,ডলু নদীর পানি এখনো বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিতা হচ্ছে। সাতকানিয়ার কাঞ্চনা,ধর্মপুর,নলুয়া,বাজালিয়া,পুরানগড়,কাশিয়াইশসহ সংশ্লিষ্ট এলাকা কয়েকদিন ধরে জলপ্লাবিত।

চন্দনাইশের জোয়ারা,বরমা,সুচিয়া, হারলা, বরকল, সাতবাড়িয়া, কাঞ্চননগরসহ অধিকাংশ এলাকায় সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

আনোয়ারার বারসাত,রায়পুর,জিঁদন্ডী,বরুণচড়া,বৈরাগ, হাইলধর পরৈকোড়া, চাতরি,বটতলী, আনোয়ারা সদরের বন্যা পরিস্থিতিও অপরিবর্তনীয় রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিনিধি।

খাগড়াছড়ির দীঘিনালা এবং রাঙ্গামাটির লংগদু উপজেলার প্রধান সড়কের একাধিক অংশ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে সড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়েছে। জলমগ্ন সড়কে গাড়ির বদলে এখন নৌকাই হয়ে উঠেছে যাতায়াতের একমাত্র বাহন।

জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার শাহাদাত বলেন, “বন্যা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র চালু রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

রাঙামাটির বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসের আশঙ্কা, সড়ক যোগাযোগে বাধা এবং জলাবদ্ধতার কারণে জনজীবনে দুর্ভোগ বেড়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে জেলার সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণি পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মুহাম্মদ ইমরানুল হক ভূঁইয়া বলেন, অনেক জায়গায় ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটছে। আমরা কোন প্রাণহানি চাই না। তাই যারা এখনো ঝুঁকি নিয়ে এরাকায় আছেন, তারা দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে চলে আসার আহ্বান জানান তিনি।

প্রবল বর্ষণে বান্দরবানে পাহাড়ধসে শিশুসহ ৫ জনের করুণ মৃত্যু হয়েছে।

লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. মঈন উদ্দিন বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। গত চার দিন ধরে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও অনেকে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছিলেন। আমরা নিহতদের পরিবারকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করব।”

পূর্বতারা/ইউডি

ভিডিও