সড়কের এক পাশে গাড়ির লম্বা সারি। সেই সারির শেষ কোথায়, তা বোঝাই কঠিন। কর্ণফুলীর চরফরিদ এলাকার ‘ফয়সিল ও জিলানী’ সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে ক্রসিং মোড় পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটারজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন যানবাহন। কারও গন্তব্য যাত্রী নিয়ে শহরের দিকে, কারও উদ্দেশ্য শুধু গাড়ির ট্যাংকে কয়েক লিটার গ্যাস ভরা। কিন্তু সবার অপেক্ষা একই জায়গায়—গ্যাসের জন্য।
চট্টগ্রামজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকটের প্রভাব এখন সবচেয়ে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় যেখানে কয়েক মিনিটেই জ্বালানি নেওয়ার কথা, সেখানে চালকদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে তিন থেকে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত। কখনো অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হচ্ছে।
মঙ্গলবার সকাল থেকে গভীর রাত ও বুধবার (৫ আগস্ট) দুপুর পর্যন্ত কর্ণফুলীর বিভিন্ন স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে একই চিত্র। বৃষ্টি উপেক্ষা করে চালকেরা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। কেউ গাড়ির ভেতরে বসে সময় কাটাচ্ছেন, কেউ নেমে অন্য চালকদের সঙ্গে কথা বলছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও কখন গ্যাস পাওয়া যাবে, তার নিশ্চয়তা নেই।
বাঁশখালী থেকে গ্যাস নিতে আসা সিএনজিচালক আবদুর রহিম বলেন, কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক সময় পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যায় না। রাত পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এতে একদিকে সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে গাড়ি চালিয়ে যে আয় করার কথা, সেটিও হচ্ছে না।

কর্ণফুলী উপজেলার সাত সিএনজি ফিলিং স্টেশন—ফয়সিল, তৈয়ব শাহ, কর্ণফুলী, প্রাকৃতিক, জিলানী, কামাল ব্রাদার্স ও ফোর স্টার ঘুরে প্রায় একই চিত্র পাওয়া গেছে। স্টেশনগুলোর ভেতরে জায়গা না থাকায় অনেক সময় মহাসড়ক ও আশপাশের সড়কের একাংশ পর্যন্ত যানবাহনের সারি ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে তৈরি হচ্ছে যানজট।
রহমান অ্যান্ড কোং লিমিটেডের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ইউনিট-২ ‘ফয়সিল’ সিএনজি ফিলিং স্টেশনের ইনচার্জ মো. আবু তৈয়ব বলেন, গ্রাহকদের দ্রুত সেবা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন তারা। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টা স্টেশন বন্ধ থাকে। বাকি সময় সেবা চালু থাকলেও গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এই অপেক্ষার সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন অটোরিকশাচালকেরা। স্থানীয় চালক মোহাম্মদ মন্নানের কাছে গ্যাসের সংকট মানে শুধু লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা নয়, দিনের আয় কমে যাওয়া। তার ভাষায়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে ট্রিপ কমে যাচ্ছে। আয় কমে যাওয়ায় ঋণের কিস্তি পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
চালকদের দাবি, আগে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যেই গ্যাস নেওয়া যেত। এখন একই কাজের জন্য কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আবার গ্যাসের চাপ এত কম থাকে যে অনেক সময় পূর্ণ ট্যাংকও ভরা যায় না। ফলে অর্ধেক গ্যাস নিয়েই স্টেশন ছাড়তে হচ্ছে।
আনোয়ারার চালক মোহাম্মদ রুবেল বলেন, লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে প্রতিদিনের ট্রিপের সংখ্যা কমে গেছে। ফলে আয়ও কমেছে। আর চালকেরা কম গাড়ি চালাতে পারায় যাত্রীদেরও দীর্ঘ সময় রাস্তায় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
কেজিডিসিএলের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিস্ট্রিবিউশন) রফিক খান বলেন, গত ১০ দিন ধরে গ্যাসের সংকট চলছে। ছুটির দিনে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য আরও খারাপ হওয়ায় পরিস্থিতি তীব্র হয়েছে। গত শনিবার রাত থেকে চট্টগ্রামের প্রায় সব এলাকাতেই গ্যাসের চাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
গ্যাস সংকটের পেছনে জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থার ঘাটতিও বড় কারণ। সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২১৫ কোটি ঘনফুট। একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় প্রতিদিন প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে।
এর প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামের আবাসিক, শিল্প ও পরিবহন খাতে। কোথাও রান্নার সময় গ্যাসের চাপ থাকছে না, কোথাও শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আর সিএনজি স্টেশনগুলোতে সংকটের চিত্র দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ যানবাহনের সারিতে।