,

 

চট্টগ্রামের ২৬ পাহাড়ে ধসের ঝুঁকি, শঙ্কায় ৬ হাজারের বেশি পরিবার

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ : 8 July 2026, 06:52

কয়েক দিনের অতি ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রামের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে নগরের ২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে আবারও ভয়াবহ ভূমিধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এসব পাহাড়ে বসবাসকারী ৬ হাজার ৫৫৮টি পরিবার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। চট্টগ্রাম নগর ও কক্সবাজারে পাহাড়ধসে মৃত্যুর পর উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (৮ জুলাই) সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ২৩৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে। এতে জলাবদ্ধতার পাশাপাশি পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেয়েছে।

চট্টগ্রাম পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, অতীতে একাধিক প্রাণঘাতী ভূমিধস, উচ্ছেদ অভিযান, আদালতের নির্দেশনা এবং পুনর্বাসনের নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও নগরের ২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে এখনও ৬ হাজার ৫৫৮টি পরিবার বসবাস করছে। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের মতে, ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ও আশপাশে প্রায় ১০ লাখ মানুষের বসবাস করছেন। গত ৩ বছরে পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষগুলোর তালিকা হালনাগাদ না হওয়ায় সরকারের কাছেও নেই নির্ভুল তথ্য।

সরকারি নথি, জেলা প্রশাসন এবং পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম শহরের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো হচ্ছে আকবর শাহ থানার ফয়’স লেক সংলগ্ন ১ নম্বর, ২ নম্বর ও ৩ নম্বর ঝিল এলাকার পাহাড়, শান্তিনগর পাহাড়, বেলতলি ঘোনা, জঙ্গল সলিমপুর পাহাড়, বায়েজিদ লিংক রোড সংলগ্ন পাহাড়, ফিরোজ শাহ কলোনি পাহাড়, লালখান বাজারের মতি ঝরনা পাহাড়, বাটালী হিল, পোড়া কলোনি পাহাড়, টাংকির পাহাড়, ষোলশহর রেলস্টেশন সংলগ্ন পাহাড়, বিজয়নগর পাহাড়, আমিন জুট মিলস পাহাড়, ভেড়া ফকিরের পাহাড়, বার্মা কলোনির পাহাড়, নাসিরাবাদ শিল্প এলাকা সংলগ্ন পাহাড়, লেক সিটি আবাসিক এলাকার পাহাড়, এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানির পাহাড়, ইস্পাহানী পাহাড় এলাকা এবং সিডিএ অ্যাভিনিউ সংলগ্ন কয়েকটি ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড়।

পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, আকবর শাহ থানার ১, ২ ও ৩ নম্বর ঝিল সংলগ্ন পাহাড়ে সবচেয়ে বেশি অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে। শুধু এই এলাকাতে ৪ হাজার ৪৭৬টি পরিবার ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে, যা নগরের মোট ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের প্রায় ৬৮ শতাংশ।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোকে পাঁচটি জোনে ভাগ করে প্রতিটি জোনে একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়েছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ব্র্যাক প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়, ওয়াইডব্লিউসিএ কমিউনিটি স্কুল, ইলমুল কোরআন মাদ্রাসা ও আল হেরা মাদ্রাসাসহ কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্রে ইতোমধ্যে দুই শতাধিক মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। আবহাওয়ার আরও অবনতি হলে আশ্রয়কেন্দ্রে লোকসংখ্যা বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

নগরের বাইরে সীতাকুণ্ড, রাঙ্গুনিয়া, লোহাগাড়া ও ফটিকছড়িসহ বিভিন্ন পাহাড়ি উপজেলাতেও ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়েছে। উপজেলা প্রশাসনগুলো পাহাড়ের পাদদেশ ও ঢালু এলাকায় বসবাসকারীদের মাইকিং করে সতর্ক করছে এবং প্রয়োজনে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর, সোনাইছড়ি, কুমিরা, বাঁশবাড়ীয়া ও বারৈয়াঢালা, লোহাগাড়ার চুনতি ও পুটিবিলা এবং রাঙ্গুনিয়ার কয়েকটি এলাকা বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছে।

এরই মধ্যে দুর্যোগের প্রভাবও দেখা দিয়েছে। গত দুই দিনে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে মোট ২০ জনের বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের রহমাননগরে দেয়াল ধসে একজন এবং রাঙ্গুনিয়ায় পাহাড়ধসে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া বুধবার চট্টগ্রামে নগরীর চশমা হিলের মেয়র গলি ও সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে পাহাড় ধসে ২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে কক্সবাজারের গত কয়েকদিনে অনন্ত ১৮ জনের প্রাণহাণি ঘটেছে পাহাড়ধসে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড় কাটা, বন উজাড়, অপরিকল্পিত বসতি, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিপাতই চট্টগ্রামে ভূমিধসের প্রধান কারণ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আলক পাল বলেন, বাংলাদেশের পাহাড়ের মাটি নরম ও আলগা হওয়ায় দীর্ঘ সময়ের ভারী বৃষ্টিতে ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে সহজেই ভূমিধসের সৃষ্টি হয়।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান দেলোয়ার মজুমদার বলেন, বড় বড় দুর্ঘটনার পরও পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত বসতি ও পুনর্বাসনের স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় প্রতি বর্ষায় একই ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা না করলে এ সংকট থেকে মুক্তি মিলবে না।

এদিকে টানা বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার মধ্যে জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ১০১ সদস্যের একটি র‌্যাপিড রেসপন্স টিম গঠন করেছে। রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে গঠিত এই দল সার্বক্ষণিক মাঠে থেকে দুর্যোগ মোকাবিলায় কাজ করবে বলে জানিয়েছেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়েছে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। তিনি বলেন, আগে জীবন, তারপর অন্য সবকিছু। কোনো অবস্থাতেই ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান করা উচিত নয়।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ল্যান্ডস্লাইড ডেটাবেজের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় ভূমিধসে ২৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ২০০৭ সালের জুনে, যখন কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট ভূমিধসে ১২৮ জন প্রাণ হারান।

ভিডিও