শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

অকেজো যন্ত্রাংশে ভরা চমেকের আইসিইউ, অক্সিজেন পাইপের অভাবে প্রাণ গেল শিশুর

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ : ১৯ মে ২০২৬, ০৭:৫৮

একটি অক্সিজেন পাইপের অভাবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশু আইসিইউতে মারা গেল ৯ মাস বয়সী শিশু সুরাইয়া আলম। হামে আক্রান্ত শিশুটিকে বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত নিজের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন ক্যামেরাও বিক্রি করেছিলেন বাবা মোহাম্মদ আলম। কিন্তু প্রয়োজনীয় হাই-ফ্লো নাজাল ক্যানুলা সার্কিট হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই নিভে যায় ছোট্ট প্রাণটি।

গতকাল সোমবার দুপুর পৌনে ২টার দিকে চমেক হাসপাতালের শিশু আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় সুরাইয়া। এ সময় আইসিইউর সামনে বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়েন তার বাবা-মা। বাবার হাতে তখনও ধরা ছিল নাজাল ক্যানুলার নাম লেখা স্লিপ।

কক্সবাজার সদর উপজেলার বাসিন্দা মোহাম্মদ আলম পেশায় একজন আলোকচিত্রী। সৈকতে পর্যটকদের ছবি তুলে সংসার চালান তিনি। গত বৃহস্পতিবার রাতে হাম আক্রান্ত মেয়েকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করান। অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে শিশু আইসিইউতে নেন।

স্বজনদের অভিযোগ, প্রথমে সুরাইয়াকে যে হাই-ফ্লো মেশিন দেওয়া হয়, সেটিতে ফুটো ছিল। পরে আরেকটি মেশিন দেওয়া হলেও সেটিতেও সমস্যা দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকরা রোগীর বাবাকে বাইরে থেকে হাই-ফ্লো নাজাল ক্যানুলা বা অক্সিজেন পাইপ কিনে আনতে বলেন।

কয়েক ঘণ্টার চেষ্টার পর ১১ হাজার টাকা দিয়ে একটি কোম্পানি থেকে অক্সিজেন পাইপ সংগ্রহ করেন মোহাম্মদ আলম। কিন্তু সেটি হাসপাতালে নিয়ে ফেরার আগেই মারা যায় তার মেয়ে।

সন্তান হারানোর শোকে ভেঙে পড়ে মোহাম্মদ আলম বলেন, মেয়েকে বাঁচাতে সব করেছি। চিকিৎসার খরচ জোগাতে আমার ক্যামেরাটাও বিক্রি করেছি। এতো বড় হাসপাতালে অক্সিজেন পাইপ থাকবে না, এটা কেমন কথা? আগে বললেও হয়তো অন্য ব্যবস্থা নিতে পারতাম।

এদিকে শিশুটির মা ছেনোয়ারা বেগম আইসিইউর সামনে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমার মেয়ে চলে গেছে, আর কোনো অক্সিজেন পাইপ লাগবে না, কিছুই লাগবে না।

হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চমেকের শিশু আইসিইউটি বেসরকারি অনুদানে প্রতিষ্ঠিত। সেখানে কোনো যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে অনেক সময় চিকিৎসক বা রোগীর স্বজনদের টাকায় তা কিনতে হয়।

তিনি জানান, হাই-ফ্লো নাজাল ক্যানুলা রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখতে ব্যবহৃত হয়। এর মাধ্যমে নাকে উচ্চ প্রবাহে উষ্ণ ও আর্দ্র অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়, যা শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন শ্বাসযন্ত্রজনিত জটিলতায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চিকিৎসক আরও জানান, সুরাইয়ার শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছিল এবং হামের জটিলতা থেকে তার মস্তিষ্কে মিজেলস এনসেফালাইটিস বা প্রদাহ তৈরি হয়।

চানা গেছে, চমেক হাসপাতালের শিশু আইসিইউতে মোট ২০টি শয্যার মধ্যে বর্তমানে ১৫টিতে রাখা হয়েছে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি শিশুদের। আইসিইউতে হাই-ফ্লো মেশিন রয়েছে ১২টি। কিন্তু এর মধ্যে কয়েকটির যন্ত্রাংশ অকেজো বলে অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে শিশুটির মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, দায়িত্বরত চিকিৎসক পরিস্থিতি না বুঝেই শিশুটির বাবাকে বাইরে থেকে হাই-ফ্লো নাজাল ক্যানুলা আনতে বলেছিলেন।

চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিন বলেন, ২০ শয্যার আইসিইউর ১০টি অনুদানে, ১০টি সরকারিভাবে করা। হাই-ফ্লো মেশিন পুরো হাসপাতালে ৪১টি আছে। রোগীর পক্ষে হাই-ফ্লো নাজাল ক্যানুলা কেনা সম্ভব না। ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ভিডিও