চট্টগ্রামে হামের প্রকোপ বাড়তে থাকায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে সৃষ্টি হয়েছে শয্যা সংকট। একেকটি বেডে দুই থেকে চার শিশুকে গাদাগাদি করে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এতে শিশুদের কষ্ট যেমন বাড়ছে, তেমনি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকার বাসিন্দা রাজিয়া সুলতানা তার ছয় মাস বয়সী ছেলে মো. তাসনিমকে নিয়ে চার দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। প্রচণ্ড গরমে ছেলেকে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন তিনি। একই শয্যায় তার পাশেই ফটিকছড়ির রোকেয়া বেগম নিজের এক বছরের সন্তানকে কোলে নিয়ে একইভাবে সেবা দিচ্ছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হামের কারণে আক্রান্ত শিশুদের জন্য আলাদা শয্যা তো দূরের কথা, একটি ছোট বেডেই দুই থেকে তিনজন করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এই সংখ্যা তিন থেকে চারজনেও পৌঁছাচ্ছে। বেড না পেয়ে অনেক শিশুকে ফ্লোরেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
সরেজমিনে চমেক হাসপাতালের হাম কর্নার ঘুরে দেখা যায়, ওয়ার্ডজুড়ে এক মানবেতর দৃশ্য। কোনো শিশুর মুখে অক্সিজেনের নল, কারও হাতে স্যালাইন, আবার কারও শরীরজুড়ে লাল ফুসকুড়ি। শিশুদের কান্না আর যন্ত্রণায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো পরিবেশ।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ১৬ শয্যার এই বিশেষ ইউনিটে প্রতিদিন গড়ে ৫০ জনের বেশি শিশু ভর্তি থাকছে। বুধবার পর্যন্ত ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৬৪ জন। এর মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় থাকা আটজনকে শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (পিআইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়েছে। প্রতিদিন নতুন করে ১৫ থেকে ২০ জন রোগী ভর্তি হচ্ছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, এক শয্যায় তিন-চারজন শিশু থাকায় চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে উঠেছে। শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ানো বা ওষুধ দেওয়ার মতো ন্যূনতম জায়গাও নেই।
শিশু ওয়ার্ডের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা বলেন, ‘হাম কর্নারে প্রতিদিন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। শয্যা সংকটের কারণে একই বেডে একাধিক শিশুকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। বাড়তি চাপ সামাল দিতে চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।’
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে হামের লক্ষণ নিয়ে দুই শতাধিক শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ৩৭৩ শিশুর নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে ৩৭ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘অনেক শিশু টিকা নেওয়ার আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু হয়েছে।’
হামের এই বাড়তি সংক্রমণ এবং হাসপাতালের নাজুক পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এজন্য জরুরি ভিত্তিতে শয্যা বাড়ানো, চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের তাগিদ দিয়েছেন তারা।