কারও স্বপ্ন ছিলো পরিবারের সাথে ঈদ উদযাপনের। আবার কেউবা উৎসাহ উদ্দীপনায় ঈদের আনন্দ শেষে ফিরছিলেন কর্মক্ষেত্রে। অনেকেরই গন্তব্য ছিলো ছুটি শেষে প্রবাসে পাড়ি দেওয়ার। ছুটিতে জমিয়ে আড্ডা দিতে পাহাড় সাগরে ঘুরতেও বেরিয়েছিলেন অনেকে। কে জানতো আশা, আনন্দ আর প্রশান্তির এই যাত্রা পথে আছে কত নাটকীয়-তিক্ত ঘটনা। পথের কোন বাঁকে লুকিয়ে আছে কার মৃত্যুদূত। কেউ হয়তো ভাবেনি, চিন্তাও করেনি। তবে, পথে পথে ঝরে পড়া তাজা প্রাণগুলো দেখাচ্ছে বাস্তবতা। সামান্য ভুল কিংবা বেপরোয়া মনভব এক করেছে রক্ত ও অশ্রু। যেখানে মলিন হয়েছে ঈদের আনন্দ।
জানা গেছে, গত ২১ মার্চ দেশে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্যাপিত হয়েছে। ঈদ উপলক্ষে ১৭ মার্চ পবিত্র শবে কদরের ছুটিসহ টানা সাত দিন অফিস-আদালত বন্ধ ছিল। এই সাত দিনে চট্টগ্রাম জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সাতকানিয়ায় দুজন, পটিয়ায় দুজন এবং মিরসরাই, লোহাগাড়া ও আনোয়ারায় তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। অধিকাংশই মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার দুর্ঘটনা।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, এই সাত দিনে হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগে নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে ৩৬০ জন। যাদের মধ্যে ১৪৯ জন সড়ক দুর্ঘটনার শিকার। অর্থাৎ নতুন রোগীদের প্রায় ৪১ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আঘাত গুরুতর না হলে অনেকেই ক্যাজুয়ালটি বিভাগ থেকে চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছাড়ছেন।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় ৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৪ জন নিহত ও ৯৫ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ঈদের ছুটির সাত দিন (১৭ থেকে ২৩ মার্চ) ঘটেছে ১৬টি দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৬ জন এবং আহত হয়েছেন ৬০ জন। অর্থাৎ মোট নিহতের ৫৯ শতাংশ এবং আহতের ৬৩ শতাংশই ঘটেছে ঈদের ছুটির এই সাত দিনে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় প্রাইভেট কারের ধাক্কায় একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দুই যাত্রী নিহত হন। লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের নোয়াপাড়া এলাকায় সড়ক পারাপারের সময় মোটরসাইকেলের ধাক্কায় গত মঙ্গলবার গুরুতর আহত হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী।
গত বৃহস্পতিবার হাটহাজারীতে বেপরোয়া গতির ট্রাকের চাপায় এক বাইক আরোহী নিহত হন। এদিন ভোর সোয়া ৪টার দিকে উপজেলার বানিয়ারছড়া এলাকার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে বাসের ধাক্কায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন। একই দিন চন্দনাইশে কক্সবাজারমুখী একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ধানখেতে পড়ে বাসের চালকের সহকারীসহ দুজন আহত হন।
এছাড়া শনিবার সীতাকুণ্ডে প্রাইভেটকারের সিলিন্ডার বিষ্ফোরণে ৬ জন আহত এবং পটিয়ায় ৩ জন আহতসহ ঘটেছে আরও অনেক দুর্ঘটনা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদের ছুটিতে দূরপাল্লার যাত্রা, ভ্রমণ ও গ্রামমুখী মানুষের ঢল একসঙ্গে হওয়ায় সড়কে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি; অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্যের অভাব ও নিয়ম না মানার প্রবণতা। বিশেষ করে মোটরসাইকেলের বেপরোয়া গতি, হেলমেট ব্যবহার না করা, উল্টো পথে চলাচল ও অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ কাওসারুল মতিন বলেন, ‘শয্যাসংখ্যা ৮৮ হলেও এর দেড়-দুই গুণ বেশি রোগী সামলাতে হয়। বিভাগের সব জেলার মানুষ এখানে আসেন। দুর্ঘটনার পাশাপাশি ট্রমা রোগীরাও আসেন এখানে। আমাদের আলাদা একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রয়োজন।’
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা রয়েছে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল বন্ধ করা, চালকদের সঠিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং মহাসড়কে আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের উত্তর জোনের উপ-কমিশনার (ডিসি) নেছার উদ্দিন আহমেদ পূর্বতারাকে বলেন, ‘উঠতি বয়সী তরুণদের মধ্যেই বেপরোয়া গাড়ি চালানোর প্রবণতা বেশি দেখা যায়। অনেকেরই বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই, আবার যারা চালাচ্ছে তাদের অনেকেই যানবাহন চালানোর সঠিক নিয়ম-কানুন সম্পর্কে অবগত নয়। ফলে তারা অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালায় এবং নিরাপত্তা সরঞ্জাম, বিশেষ করে হেলমেট ব্যবহার করে না। দ্রুত কোথাও পৌঁছানোর তাড়াহুড়া থেকেই অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে।’
তিনি বলেন, ‘সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি সড়কের একটি নির্দিষ্ট গতি ও নিয়ম রয়েছে, তা মেনে চললে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।’ সবাই সচেতন হয়ে নিয়ম মেনে শৃঙ্খলাভাবে গাড়ি চালালে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।