শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

কাছে থেকেও দূরে মীর হেলাল-ডা. শাহাদাত

উজ্জ্বল দত্ত

প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৬, ০৮:০০

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিনের স্নায়ুদ্বন্দ্ব ওপেন সিক্রেট একটি বিষয়। নগর বিএনপির কমিটি গঠনের পর থেকে এই দুই নেতার দ্বন্দ্বের কথা রাজনীতি পাড়ায় আলোচিত। এই দ্বন্দ্বের বিভক্তি নেতা ছাড়িয়ে কর্মী সমর্থকদের মধ্যেও সংক্রমিত হয়ে গেছে বলে মনে করেন অনেক রাজনীতিক। দুই নেতার মুখ দেখাদেখিও বন্ধ অনেকদিন। তবে দীর্ঘদিন পর মহান স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে দুই নেতাকে এক ফ্রেমে দেখা গেছে।

বৃহস্পতিবার সকালে নগরীর উত্তর কাট্টলীস্থ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের সময় ডা. শাহাদাত হোসেন ও মীর হেলাল উদ্দিনকে পাশাপাশি অবস্থান করতে দেখা গেছে। এমন দৃশ্য দেখে নেতাকর্মীদের মাঝে দুই নেতাকে নিয়ে নানা গুঞ্জন শুরু হয়েছে।

দুই নেতার দ্বন্দ্বের শুরু
মীর হেলালের সাথে ডা. শাহাদাত হোসেনের দ্বন্দ্বের ওপেন সিক্রেট হয়ে যায় গত দুই বছর আগে থেকে। আর তা হচ্ছে নগর বিএনপির কমিটি গঠনের বিষয় নিয়ে। ডা. শাহাদাত হোসেন একটানা ১৪ বছর নগর বিএনপিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি প্রথমে নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তীতে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘসময় ধরে কমিটিতে থাকার কারণে নগর বিএনপিতে তার একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার হয় বলে অভিযোগ ছিল। এ নিয়ে আরেকটি পক্ষ ডা. শাহাদাতের উপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৭ জুলাই ডা. শাহাদাত হোসেনকে নগর বিএনপির নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। গঠন করা হয় নতুন কমিটি। কমিটিতে আহবায়ক হিসেবে বর্তমান সাংসদ এরশাদ উল্লাহ এবং সদস্য সচিব হিসেবে নাজিমুর রহমানকে দায়িত্ব দেয়া হয়। নগর বিএনপির এই নতুন কমিটি গঠনের পেছনে মীর হেলালের ম্যাকানিজম ছিল বলে আলোচনা উঠে। মীর হেলালের সাথে নাকি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। মীর হেলালের অনুরোধে তারেক রহমান এই নতুন কমিটিকে মনোনয়ন দেন। আর এই কারণে মীর হেলাল ও ডা. শাহাদাত হোসেনের মধ্যে বৈরিতা সৃষ্টি হয়।

দ্বন্দ্বের কারণে বন্ধ মুখ দেখাদেখি
ডা. শাহাদাত হোসেন ও মীর হেলালের দেখা-সাক্ষাৎ নেই দীর্ঘদিন। অনুষ্ঠানে গেলে দেখা হবে, দেখা হলে কথা বলতে হবে- তাই রাজনৈতিক, সামাজিক কোন অনুষ্ঠানে একজন থাকলে আরেকজন তা এড়িয়ে চলেন। ২৬ ফেব্রুয়ারি চিটাগাং ক্লাবে খাতুনগঞ্জ ট্রেড এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের ইফতার মাহফিলে দুই নেতা আমন্ত্রণ পেলেও শাহাদাত হোসেন সেখানে যাননি। ৪ মার্চ চিটাগাং ক্লাবে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের ইফতার মাহিফলে মীর হেলাল আর ডা. শাহাদাত দুই নেতাই দাওয়াত পেয়েছিলেন। তবে বরাবরের মত ওই মাহফিলেও ডা. শাহাদাত ছিলেন অনুপস্থিত। ৬ মার্চ জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ ময়দানে মেজবানি ইফতারের আয়োজন করে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি। সেখানেও যাননি ডা. শাহাদাত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগর বিএনপির এক সিনিয়র নেতা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ডা. শাহাদাত আমন্ত্রণ পাচ্ছেন একথা সত্য। তবে অনুষ্ঠানগুলোতে আয়োজকরা পদমর্যাদা অনুযায়ী মীর হেলালকে ডা. শাহাদাতের ওপরে রাখছেন। মীর হেলাল প্রধান অতিথি হলে ডা. শাহাদাতকে করা হচ্ছে প্রধান বক্তা। মীর হেলালকে প্রধান বক্তা করা হলে ডা. শাহাদাতকে করা হচ্ছে বিশেষ অতিথি। আর বয়সে সিনিয়র হওয়ায় এই বিষয়টি সহজভাবে নিতে পারছেন না ডা. শাহাদাত হোসেন। তাই আমন্ত্রিত হলেও তিনি অনুষ্ঠানগুলো এড়িয়ে যাচ্ছেন।

দুই নেতার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার
রাজনীতি বা বয়সের দিক দিয়ে ডা. শাহাদাত হোসেন মীর হেলালের সিনিয়র। ডা. শাহাদাতের বয়স এখন ৬০ বছর আর মীর হেলালের বয়স এখন ৪৪ বছর। শাহাদাত হোসেন বিএনপির সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমানের রাজনৈতিক শিষ্য ছিলেন। ডা. শাহাদাত হোসেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ছাত্রদলের সভাপতিও ছিলেন। নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, পরবর্তীতে সভাপতি। বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদকও ছিলেন। এখন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র। মেয়র হওয়ার পর তিনি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদাও লাভ করেছেন।

অপরদিকে, মীর হেলাল যুক্তরাজ্য থেকে ব্যারিস্টার- অ্যাট-ল ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এরপর দেশে এসে তিনি আইন পেশায় যুক্ত হন।তিনি জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন’র পরিচালক এবং লিগ্যাল রিসার্চ সেলের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। তারপর তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য হন। চট্টগ্রাম বিভাগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক পদে দায়িত্বও তিনি পালন করছেন। বর্তমানে মীর হেলাল চট্টগ্রাম-৫ আসনের সাংসদ এবং বাংলাদেশ সরকারের ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী।

তবে মহান স্বাধীনতা দিবসের শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানে দুই নেতাকে পাশাপাশি দাঁড়াতে দেখা গেলেও পরস্পরকে কথা বলতে দেখা যায়নি। অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মীর হেলাল প্রথমে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তারপর মেয়র হিসেবে ডা. শাহাদাত হোসেন শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দীন গণমাধ্যমকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের আধুনিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের নতুন এক রূপরেখা আপনাদের সামনে উপহার হিসেবে দিয়েছেন। সরকারের মেনিফেস্টোর মূল ভিত্তি হলো জনকল্যাণ এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক, দেশপ্রেমের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে একটি শোষণমুক্ত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, মহান স্বাধীনতা দিবসে আমি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সব বীর সন্তানদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। যাঁরা আত্মত্যাগের মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন, তাঁদের অবদান জাতি কখনো ভুলবে না।

ভিডিও