শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

‘এখন আমায় আশার কথা বলবে কে?’

সন্দ্বীপ প্রতিনিধি

প্রকাশ : ৩ মার্চ ২০২৬, ০৮:৫৬

“আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না বাবা নেই। দুর্ঘটনার আগের দিনও ভিডিও কলে দীর্ঘক্ষণ কথা হয়েছে। বলেছিলেন, ‘মা, আল্লাহর কাছে চেয়ে তোমাকে পেয়েছি। তুমি আমার অমূল্য ধন, তোমার কোনো আশা অপূর্ণ রাখব না।’—এখন কে আমাকে সেই আশার কথা বলবে, কে শুনবে সেই স্বপ্নে কথা?”

কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই আহাজারি করছিলেন বাহরাইনে ড্রোন হামলার ধ্বংসাবশেষ প্রাণ হারানো চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের প্রবাসী আবুল মহসিন তারেকের একমাত্র সন্তান কলেজ ছাত্রী তামান্না। তিনি বলেন, “ঈদের কয়েক দিন আগে বাবার দেশে আসার কথা ছিল। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা করে আবার বাহরাইনে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তার আর ফেরা হলো না। আমার বাবাকে হারিয়েছি। আর ফিরে পাব না, কিন্তু আর কারও কাউকে যাতে বাবা হারাতে না হয়। এ যুদ্ধ বন্ধ হোক।”

আবুল মহসিনের মেয়ে আরও বলেন, “বাবা দেশে থাকলে হয়তো বেঁচে যেতেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বাবা প্রতিদিনই কয়েকবার ভিডিও কলে কথা বলতেন। সর্বশেষ রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বাবার সঙ্গে আমি ও মায়ের কথা হয়। এরপর রাতে ফোন করা হলে পাওয়া যাচ্ছিল না। ফোনে রিং হচ্ছিল, কেউ ধরছিল না। গতকাল সকালে একই কোম্পানিতে কাজ করা আমাদের এক আত্মীয় বাবা মারা গেছেন বলে জানান।”

মহসিনের গ্রামের বাড়ি সন্দ্বীপের আজিমপুরে। তবে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে পৈতৃক ভিটা। প্রায় দুই যুগ আগে থেকে পরিবার নিয়ে চট্টগ্রাম শহরের হালিশহর ঈদগাঁও সংলগ্ন আমতল এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন তিনি। ১৭ বছর ধরে বাহরাইনে কর্মরত তারেকের উপার্জনেই চলত পুরো সংসার। কিন্তু দীর্ঘ প্রবাস জীবনের পরও ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় বলতে তেমন কিছুই রেখে যেতে পারেননি। সর্বশেষ গত সোমবার (২ মার্চ) বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টা (বাহরাইন সময় রবিবার দিবাগত রাত ২টা) বাহরাইনের আল হিদ ড্রাইডক এলাকায় অবস্থিত আরব শিপবিল্ডিং অ্যান্ড রিপেয়ার ইয়ার্ডে কর্মরত অবস্থায় প্রাণ হারান মহসিন।

বর্তমানে তার কলেজপড়ুয়া একমাত্র মেয়ে তামান্না ও স্ত্রী সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়েছেন। বাহরাইনে একই ইয়ার্ডে কর্মরত তার চাচাতো ভাই নুর হোসেন বেলাল বলেন, তারেক ভাই নিজের সবকিছু বিলিয়ে দিয়ে পরিবার চালিয়েছেন। কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য কিছু গুছিয়ে যেতে পারেননি। এখন তাদের দেখার মতো আর কেউ রইল না।

সহকর্মী নুর হোসেন বেলাল মোবাইল ফোনে আরও জানান, নিহত তারেকের মরদেহ বর্তমানে কিং হামাদ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। একই ঘটনায় আহত সন্দ্বীপের নাজিম উদ্দিন ও টাঙ্গাইলের কামরুলও ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নাজিমের অবস্থা মোটামুটি স্থিতিশীল হলেও কামরুলের হাতে অস্ত্রোপচার হয়েছে এবং তিনি আইসিইউতে রয়েছেন।

এদিকে সোমবার বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত রইস হাসান সারোয়ার হাসপাতালে গিয়ে আহতদের খোঁজখবর নেন এবং নিহত তারেকের মরদেহ দ্রুত দেশে পাঠানোর আশ্বাস দেন।

প্রবাসীরা বলছেন, মিনহাজ সালমান জুপের এলাকায় অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আল হিদ ড্রাইডক এলাকা থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে। সাম্প্রতিক সময়ে ওই ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে একাধিক মিসাইল ও ড্রোন হামলার ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হামলার আগে সাইরেন ও মোবাইল সতর্কবার্তা পেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মানুষ ছুটোছুটি করেন।

তবে লক্ষ্যভ্রষ্ট বা প্রতিরোধের কারণে ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ আশপাশের এলাকাতেও পড়ে দুর্ঘটনা ঘটছে বলে জানান প্রবাসীরা। আতঙ্কের কারনে গত দু’দিন ধরে শিপইয়ার্ডটিতে রাতদিন কাজের পরিবর্তে এখন সীমিত পরিসরে কাজ চলছে। এ ছাড়া চলমান হামলায় উদ্বেগ উৎকন্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন হাজারো প্রবাসী।

ভিডিও