কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের আশ্রয়শিবিরে বসবাসরত প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গার জীবনে নবম বিশ্ব শরণার্থী দিবসও কোনো নতুন আশার বার্তা নিয়ে আসেনি। খাদ্যসহায়তা কমে যাওয়া, নিরাপত্তাহীনতা এবং অনিশ্চিত প্রত্যাবাসনের বাস্তবতায় তাদের জীবন যেন এক অন্তহীন অপেক্ষার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযান ও সহিংসতার মুখে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখো রোহিঙ্গার মধ্যে অধিকাংশই এখনও কক্সবাজারের ৩৩টি শরণার্থী শিবিরে অবস্থান করছে। গত নয় বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। বরং গত দেড় বছরে রাখাইনের সংঘাত ও নির্যাতনের মুখে আরও প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।
বর্তমানে তহবিল সংকটের কারণে রোহিঙ্গাদের খাদ্যসহায়তা কমে এসেছে। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, গত ১ এপ্রিল থেকে প্রয়োজনভিত্তিক রেশন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। পরিবারভেদে মাথাপিছু ৭, ১০ ও ১২ ডলার মূল্যের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তবে শিবিরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই সহায়তা দিয়ে মাসের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।
টেকনাফের লেদা শিবিরের বাসিন্দা রহিমা খাতুন বলেন, মাসের অর্ধেক যেতে না যেতেই চাল-ডাল শেষ হয়ে যায়। শিবিরের বাইরে কাজের সুযোগ না থাকায় অধিকাংশ পরিবার চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিবিরের শিশু-কিশোররা। প্রায় ছয় লাখ শিশু সীমিত শিক্ষা, বিনোদন ও খেলার সুযোগ ছাড়াই বড় হচ্ছে। অপুষ্টি, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং মানসিক বিকাশের প্রতিবন্ধকতা তাদের ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
এদিকে প্রত্যাবাসন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা চললেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি নেই। উখিয়ার বালুখালী শিবিরে বসবাসকারী সাব্বির আহমদ বলেন, নয় বছর পার হলেও দেশে ফেরার পথ খুলছে না। বর্তমানে রাখাইনের পরিস্থিতি আগের চেয়েও জটিল হয়ে উঠেছে। সেখানে নিরাপদ পরিবেশ না থাকায় প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনাও ক্ষীণ।
রোহিঙ্গা নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে শিবিরে বন্দিজীবন তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়াচ্ছে। অনেকেই মাদক, অপরাধ কিংবা সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাবে জড়িয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে নারী ও শিশুরা মানবপাচারের ঝুঁকিতে রয়েছে।
নিরাপত্তা সংকটের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগও শিবিরবাসীর জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। বর্ষায় পাহাড়ধস এবং শুষ্ক মৌসুমে অগ্নিকাণ্ডের আতঙ্ক নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে হাজারো পরিবারকে।
আরআরআরসি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ সরকার প্রত্যাবাসনকে অগ্রাধিকার দিলেও রাখাইনের বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো নিরাপদ নয়। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।