দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল (সিইআইজেড) প্রকল্প অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। প্রায় ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় ‘সাপোর্টিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রজেক্ট ফর চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ শীর্ষক প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়।
জানা গেছে, প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ সহায়তা এবং প্রায় ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ব্যয় করা হবে। বৈদেশিক অর্থায়নের অংশ চীনের এক্সিম ব্যাংকের অগ্রাধিকারমূলক ক্রেতা ঋণ (পিবিসি) সুবিধার আওতায় প্রাপ্তির প্রস্তাব রয়েছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) জানায়, কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে প্রায় ৭৮৩ একর জমির ওপর জি টু জি ব্যবস্থাপনায় গড়ে উঠছে সিইআইজেড। প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়েছে। ডেভেলপার চুক্তি স্বাক্ষর হলে মূল অবকাঠামো নির্মাণ কাজ শুরু হবে। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ধারাবাহিকতায় এ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সিইআইজেডে বৃহৎ পরিসরে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলে একটি আধুনিক শিল্প ও লজিস্টিক কেন্দ্র গড়ে উঠবে। এর ফলে কমপক্ষে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আহরণের সুযোগ তৈরি হবে।
কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় ভৌগোলিকভাবে এই অঞ্চলটির অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইসাথে সিইআইজেড বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখবে।
বেজা জানিয়েছে, প্রকল্পটি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের বিভিন্ন অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সহায়ক হবে। বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ এবং শিল্প অবকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এছাড়া অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নের অংশ হিসেবে চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী ও কর্মসংস্থানের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য বাস্তবায়নেও এ প্রকল্প অবদান রাখবে।
বেজা থেকে আরও জানায়, বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের আওতায় শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ১ হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি লিংক সড়ক; ১ হাজার ১৮১ মিটার দীর্ঘ প্রধান সড়ক; ২০ হাজার ৩০৪ ঘনমিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন পানি সংরক্ষণাগার; ৪.২৪ এমএমসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাস ট্রান্সমিশন লাইন ও ডিস্ট্রিক্ট রেগুলেটিং স্টেশন; ২৫ এমএলডি ক্ষমতাসম্পন্ন সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট; ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন বহুমুখী জেটি; ৬০ টন দৈনিক সক্ষমতার সলিড ওয়েস্ট কালেকশন স্টেশন এবং প্রায় ১২ কিলোমিটার বাউন্ডারি ওয়াল এবং দুটি ৩৩/১১ কেভি সাবস্টেশন নির্মাণ।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপ-ব্যবস্থাপক সেঁজুতি বড়ুয়া বলেন, মঙ্গলবার একনেকে ‘সাপোর্টিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রজেক্ট ফর চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ প্রকল্পটি অনুমোদন হয়েছে। খুব দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ শেষ করে প্রকল্পটির কাজ শুরু হবে। প্রকল্পটিকে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।