চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন প্রকাশ ডেভিড ইমনের চাঁদাবাজি কার্যক্রম ছিল সুসংগঠিত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে চাঁদাবাজির পুরো কার্যক্রমকে কয়েকটি পৃথক টিমে ভাগ করে পরিচালনা করা হতো বলে জানিয়েছে পুলিশ। তথ্য সংগ্রহ, চাঁদা আদায় এবং হামলা পরিচালনার জন্য আলাদা আলাদা টিম কাজ করত। গ্রেপ্তারের পর ডেভিড ইমনকে জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের দাবি, চাঁদাবাজির টার্গেট নির্ধারণ থেকে শুরু করে টাকা সংগ্রহ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই আলাদা ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া ছিল। ফলে কোনো একটি টিমের সদস্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হলেও পুরো নেটওয়ার্কের কার্যক্রম যাতে প্রকাশ না পায়, সে বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা হতো।
পুলিশ জানায়, প্রথমে ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও বিত্তশালী ব্যক্তিদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করত চক্রটির সদস্যরা। তাদের আয়-ব্যয়, ব্যবসার ধরন, সম্পদের পরিমাণ, নির্মাণাধীন ভবন, বিদেশে থাকা স্বজন এবং পরিবারের সদস্যদের চলাফেরাসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হতো। এসব তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য টার্গেট নির্ধারণ করা হতো।
টার্গেট চূড়ান্ত হওয়ার পর বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হতো বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ সময় প্রাথমিকভাবে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হতো। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গুলি, অপহরণ, হামলা কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের হুমকি দেওয়া হতো। পরিস্থিতি অনুযায়ী হামলা চালানোর জন্য আলাদা একটি দল প্রস্তুত রাখা হতো। পরে বিভিন্নজনের মাধ্যমে যোগাযোগ করে দর কষাকষি করে চাঁদার অংক নির্ধারণ করা হতো। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, ইমন কখনো বিশ লাখ টাকার নিচে চাঁদা দাবি করতেন না। দর কষাকষি করে পাঁচ লাখের উপরের অংকে সমঝোতা করতেন-এমনটাই জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) কাজী মোহাম্মদ তারেক আজিজ বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে ডেভিড ইমন সরাসরি চাঁদার টাকা গ্রহণ করতেন না বলে জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে। তথ্য সংগ্রহ, চাঁদা আদায় এবং হামলা পরিচালনার জন্য পৃথক টিম ছিল। টাকা সংগ্রহে যারা যুক্ত থাকতেন, তাদের অনেকেই অন্য এলাকা থেকে এসে নির্ধারিত কাজ শেষে চলে যেতেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চাঁদার টাকা সংগ্রহের জন্যও ছিল নির্দিষ্ট ব্যবস্থা। ভুক্তভোগীর বাসা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা নির্ধারিত স্থানে গিয়ে টাকা নেওয়া হতো। পরে এসব টাকা নগরের জিইসি মোড় এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে মোহাম্মদ ইউসুফ নামে এক ব্যক্তির কাছে জমা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ইউসুফকে ডেভিড ইমনের অর্থ লেনদেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, ইউসুফের মাধ্যমে চাঁদার টাকা হুন্ডি কিংবা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ডেভিড ইমনের কাছে পৌঁছানো হতো বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। তাকে গ্রেপ্তার করা গেলে চাঁদাবাজির অর্থের উৎস, গন্তব্য এবং এ নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত অন্যদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছে পুলিশ। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, এই অভিযানের মাধ্যমে একটি বড় সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে। বিদেশ থেকে পরিচালিত সন্ত্রাসী চক্রের বিরুদ্ধেও কাজ চলছে। এসব চক্রের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
প্রসঙ্গত, গত বুধবার যশোর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় তিন সহযোগীসহ চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন তাকে আদালতে পাঠানো হলে আদালত কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ডেভিড ইমনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে আবেদন করেছে পুলিশ। রোববার এ আবেদনের শুনানি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।