বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

চাঁদার কথা সবারই জানা, চাঁদাবাজ তবু অচেনা

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১০:১৬

চট্টগ্রামের শতবর্ষী জব্বারের বলীখেলা। এ বলীখেলা উপলক্ষে নগরীর কোতোয়ালি মোড় থেকে লালদিঘী পাড় হয়ে আন্দরকিল্লা, সিনেমা প্যালেস, জেল রোড- প্রায় আড়াই কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বসেছে বিশাল বৈশাখী মেলা। এতদ অঞ্চলে আনুমানিক দুই হাজার বিক্রেতা তাদের পণ্যের পসরা নিয়ে বসেছেন। একদিকে লোকজ ঐতিহ্য, অন্যদিকে কোটি টাকার বাণিজ্য। তারওপর দুই দিনব্যাপী এই মেলায় লাখো মানুষের সমাগম। সব মিলিয়ে জব্বারের বলী খেলা ও বৈশাখী মেলা যেন এক সাংস্কৃতিক সিগনেচার। অথচ এই মেলায় নিরব চাঁদাবাজি চলে; প্রতিবছরই বিক্রেতাদের পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ উঠে। চাঁদাবাজির কথা অকপটে স্বীকার করেন আয়োজক কমিটি থেকে শুরু করে প্রশাসনও। তবে নিরব চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর কোন পদক্ষেপ আজ পর্যন্ত চোখে পড়েনি কারো। চাঁদার কথা সবারই জানা, কিন্তু চাঁদাবাজ প্রতিরোধে কেনই বা কোন পদক্ষেপ কেউ নিচ্ছে না-সেটাই এখন প্রশ্ন ?

বিষয়টি নিয়ে জব্বারের বলী খেলা ও বৈশাখী মেলা আয়োজন কমিটির সভাপতি হাফিজুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, মেলায় চাঁদাবাজি নিয়ে আমাদের কাছেও অভিযোগ আসে। কিন্তু এই চাঁদাবাজি মেলা কমিটির পক্ষ থেকে নয়। এটি নিয়ে আমরাও বিব্রত। এলাকার একশ্রেণির কর্মহীন লোক হয়ত মেলার সময় বিক্রেতাদের কাছ থেকে ২০০ টাকা/৩০০ টাকা চাঁদা তুলে থাকতে পারেন। এদের ব্যাপারটি সবার জানা। কিন্তু নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারে না যে কারা করছে চাঁদাবাজি? মেলা কমিটির নাম দিয়ে যদি কেউ চাঁদা আদায় করে, তাহলে কমিটির কাছে অভিযোগ করার জন্য বিক্রেতাদেরকে স্পষ্ট বলা আছে।

তিনি আরও বলেন, এ ব্যাপারে অভিযোগকারীরা চাইলে পুলিশের কাছেও অভিযোগ করতে পারেন। মেলা কমিটির লোকজন খেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। খেলোয়াড়দের দেখভাল করা, খেলার নিরাপত্তাসহ নানা বিষয় নিয়ে আমাদেরকে সময় কাটাতে হয়। তারপরও মেলায় চাঁদাবাজি নিয়ে অভিযোগ পেলে আমাদের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে ইনফর্ম করা হয়।

অভিযোগ

কাশ খড়ের তৈরি নানা লোকজ পণ্য নিয়ে ঢাকা থেকে মেলায় এসেছেন মো. জুবায়ের মানিক। তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমি সারা বাংলাদেশে মেলা করি। এটাই আমার পেশা। ২০০৫ সাল থেকে জব্বারের বলী খেলায় আসছি। কিন্তু এখানে চাঁদা দিতেই হবে। চাঁদা ছাড়া এখানে ব্যবসা করা যাবে না। আমি এবার তিনটা জায়গা নিয়েছি। তিন জায়গায় আমার মাল (পণ্য ) বসাইছি। তিন দোকানে মিলে আমাকে প্রায় ২০/২৫ হাজার টাকা ওদেরকে দিতে হবে। এখানে জায়গা ভেদে চাঁদার পরিমাণটা কমবেশি হয়।

খুলনা থেকে আসা মো. আমিনুল ইসলাম নামে এক বিক্রেতা অভিযোগ করে বলেন, আমাদের মাটির জিনিসের ব্যবসা। আমরা গ্রুপ করে আসছি। আমাদের চার দোকানে ওরা ৫০ হাজার টাকা দাবি করছে। আমরা বলছি প্রতি দোকানে ২ হাজার টাকা করে দেব। দেখি কি করা যায় ?

মেলায় আদায়কৃত চাঁদার আনুমানিক পরিমাণ

লালদীঘি মাঠকে কেন্দ্র করে আন্দরকিল্লা, কোতোয়ালি, আছদগঞ্জ, সিনেমা প্যালেস, নন্দনকানন পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই মেলা। এ মেলায় সড়কের উভয় পাশ মিলিয়ে আনুমানিক দুই হাজার দোকান বসে। প্রতি দোকান থেকে যদি দুই হাজার টাকা চাঁদা আদায় হয়, তাহলে চাঁদা উঠছে ৪০ লাখ টাকা। আবার যদি দোকান প্রতি তিন হাজার টাকা চাঁদা আদায় হয় তাহলে ন্যূনতম ৬০ লাখ টাকা। বিক্রেতাদের অভিযোগ অনুযায়ী, ছোট দোকানদারকেই ২ হাজার বা ৩ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। বড় দোকানে চাঁদার পরিমাণ আরও বেশি।

কি নেই মেলায়

একটা প্রবাদ আছে জব্বারের বলী খেলার এই মেলা নিয়ে। ‘‘জব্বারের বলী খেলায় বনের বাঘও মেলে।’’ দা, ছুরি, বঁটি থেকে শুরু করে শীতলপাটি, আসবাবপত্র, মাটির তৈজসপত্র, খেলনা, গাছের চারা, লোকজ পণ্য, গৃহস্থালি ‍পণ্য —কী নেই এই মেলায়! মাটির কলসি, ফুলের টব, কিংবা শিশুদের খেলনা, বাসন-কোসন, বাদ্যযন্ত্র, কাঠের আসবাব, তৈজসপত্র থেকে নিত্য ব্যবহার্য সমস্ত জিনিসপত্রই এই মেলায় পাওয়া যায়।

মেলার বয়স

১৯০৯ সালে ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তরুণদের শারীরিকভাবে প্রস্তুত করতে এই বলীখেলার সূচনা করেন। সেই ঐতিহ্য এখন ১১৭ বছরে পা দিয়েছে।

ভিডিও