রঙ, সুর আর লোকজ ঐতিহ্যের ছোঁয়ায় নতুন বছরকে বরণ করতে প্রস্তুত বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। আলপনায় রাঙানো পথ, ঢোলের তালে মুখরিত শোভাযাত্রা আর দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক আয়োজন— সব মিলিয়ে পহেলা বৈশাখকে ঘিরে উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়েছে নগরজুড়ে। ডিসি হিল ও রেলওয়ে সিআরবি শিরিষতলাকে কেন্দ্র করে এবার আয়োজন করা হয়েছে বর্ণিল ও নজরকাড়া দুই ভেন্যুর উৎসব, যেখানে অংশ নেবেন হাজারো মানুষ।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকাল ৮টায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গণ থেকে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ শুরু হবে। নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে শোভাযাত্রাটি ডিসি হিলে গিয়ে শেষ হবে। এরপর সকাল ৯টার পর শুরু হবে দিনব্যাপী বর্ষবরণ অনুষ্ঠান, যা চলবে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত।
জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার সৈয়দ আয়াজ মাবুদ বলেন, প্রায় ১০ হাজার মানুষের অংশগ্রহণে চট্টগ্রামের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শোভাযাত্রার জন্য ইতোমধ্যেই শতাধিক মুখোশ, শোলার মোটিফ ও দুই শতাধিক সরাচিত্র তৈরি করা হয়েছে।

তিনি বলেন, বিনয় বাঁশী শিল্পী গোষ্ঠীর ঢোলবাদক দল এতে অংশ নেবে এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নানা থিমে সজ্জিত হয়ে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করবে। পাশাপাশি কৃষক, জেলে, চা বাগানের শ্রমিক ও খাল খনন কর্মসূচিতে যুক্ত শ্রমিকরাও এতে অংশ নেবেন।
পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে রাতে সার্কিট হাউজ থেকে ডিসি হিল পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কে আলপনা আঁকা হয়েছে। সৈয়দ আয়াজ মাবুদ বলেন, ‘চট্টগ্রামে বৈশাখ উপলক্ষ্যে এত দীর্ঘ আলপনা আঁকার ঘটনা এবারই প্রথম। মঙ্গলবার শোভাযাত্রা শেষে ডিসি হিলে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে প্রায় অর্ধশত সাংস্কৃতিক সংগঠন অংশ নেবে।’ বিকেলে চিশতি বাউল সংগীত পরিবেশন করবেন বলে জানান তিনি।
ডিসি হিলে অংশগ্রহণকারীরা চেরাগী মোড়, আন্দরকিল্লা ও বোস ব্রাদার্স মোড় দিয়ে ডিসি হিলে প্রবেশ করতে পারবেন। শোভাযাত্রা চলাকালীন অন্যান্য প্রবেশপথ ও সংলগ্ন সড়ক বন্ধ থাকবে। নিরাপত্তার স্বার্থে অংশগ্রহণকারীদের নির্ধারিত প্রবেশপথ ব্যবহার ও বৈধ পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে জেলা শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে সোমবার বিকেল ৩টায় চৈত্র সংক্রান্তির অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে এবং মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে মুক্তমঞ্চে দিনব্যাপী বর্ষবরণ আয়োজন চলবে।
রেলওয়ে সিআরবি’র শিরিষতলায় ‘সম্মিলিত বৈশাখী মেলা উদযাপন পরিষদ, চট্টগ্রাম’র ব্যানারে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। এই অনুষ্ঠানের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হয়েছে চট্টগ্রাম রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাব।
সিআরবি সম্মিলিত বৈশাখী মেলা উদযাপন পরিষদের সদস্য সচিব নিয়াজ মোহাম্মদ খান জানান, শোভাযাত্রার লক্ষ্য বাঙালির ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ধারণ করা এবং দেশের সমৃদ্ধ লোকজ সংস্কৃতিকে তুলে ধরা। এবারের শোভাযাত্রায় পাঁচটি মোটিফ থাকবে- মোরগ, বেহালা, পায়রা, হাতি ও ঘোড়ার। এগুলো যথাক্রমে শক্তি, সৃজনশীলতা, শান্তি, গৌরব ও গতিশীলতার প্রতীক।
তিনি আরও জানান, ৫৩ জন শিল্পীর একটি দল জাতীয় সংগীত, ‘এসো হে বৈশাখ’সহ দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করবে। এছাড়া বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী জাতীয় পতাকা বহন করবে। নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বেশ কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের মাস্ক পরা ও ব্যাগ বহন করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইংরেজি ভাষায় প্লে-কার্ড, বেলুন, ফেস্টুন ও আতশবাজিও নিষিদ্ধ থাকবে।

নিয়াজ মোহাম্মদ খান আরও বলেন, নববর্ষ উপলক্ষ্যে আয়োজিত সব কর্মসূচি সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে শেষ করতে হবে। বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রবেশের অনুমতি থাকবে, এরপর শুধুমাত্র বের হওয়ার সুযোগ থাকবে। ১৩ এপ্রিল বিকেল ৫টা থেকে সিআরবি এলাকায় শুধুমাত্র স্টিকারযুক্ত যানবাহন প্রবেশ করতে পারবে। শোভাযাত্রার দিন নির্ধারিত সড়কে মোটরসাইকেলসহ কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারবে না।
ডিসি হিল ও সিআরবি এলাকার বাসিন্দারা লাভ লেন ও সিআরবি সড়ক ব্যবহার করতে পারবেন। ডিসি হিল ও সিআরবি এলাকায় সহায়তা কেন্দ্র, নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ও অস্থায়ী চিকিৎসা ক্যাম্প স্থাপন করা হবে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মোবাইল পাবলিক টয়লেট বসানো হবে। নিরাপত্তা জোরদারে সিসিটিভি ক্যামেরা ও আর্চওয়ে স্থাপন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার সকাল ৭টা থেকে শিরিষতলায় বর্ষবরণের অনুষ্ঠান শুরু হবে এবং দিনব্যাপী এতে ৬২টি সংগঠন অংশ নেবে। চট্টগ্রাম নগরের অন্যান্য স্থানেও বর্ষবরণ উপলক্ষ্যে নানা আয়োজন রাখা হয়েছে। জাতীয় রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদ-চট্টগ্রাম দুই দিনব্যাপী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। সোমবার রাত ৮টায় নন্দনকানন বৌদ্ধ মন্দির সড়কে ‘আলপনার রঙে নববর্ষ আবাহন’ অনুষ্ঠানে শতাধিক শিল্পী অংশ নেবেন।
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টায় এনায়েত বাজার মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে বেহালা বাদনের মাধ্যমে তাদের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু হবে। সকালে ‘নব নব পল্লবরাজি সব বন উপবনে’ শিরোনামে আলেখ্য পরিবেশিত হবে। বিকেলে সুরধারা ও সঞ্চারী সংগীত একাডেমি সংগীত পরিবেশন করবে এবং ‘চিত্রাঙ্গদা’ গীতি-নৃত্য আলেখ্য মঞ্চস্থ করবে অভ্যুদয় সংগীত অঙ্গন ও নৃত্যরূপ একাডেমি। বোধন আবৃত্তি পরিষদ চট্টগ্রাম ‘বোধন বর্ষবরণ উৎসব ১৪৩৩’ আয়োজন করেছে জে এম সেন হল প্রাঙ্গণে।
পরিষদের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সন্দীপন সেন বলেন, এই আয়োজনে ২৪টি সংগঠন অংশ নেবে এবং আবৃত্তি, সংগীত, যন্ত্রসংগীত ও নৃত্য পরিবেশনার পাশাপাশি একক ও দ্বৈত সংগীতে ১০ জন শিল্পী অংশ নেবেন।