মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে একের পর এক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট স্থগিত হওয়ায় উদ্বেগ বেড়েছে চট্টগ্রামের প্রবাসীদের মধ্যে। অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি ছুটিতে দেশে এসে সময়মতো কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না। এতে চাকরি হারানোর ভয় যেমন বাড়ছে, তেমনি নির্দিষ্ট সময়ে কাজে যোগ দিতে না পারলে ভিসা বাতিল হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ট্রাভেল এজেন্সি ও এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও সমস্যাকে বাড়াচ্ছে। প্রবাসীরা বলছেন, বাতিল হওয়া ফ্লাইট কবে আবার চালু হবে, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই। ফলে বিদেশে চাকরি হারানোর ঝুঁকি বাড়ছে। এদিকে টিকিট ফেরত বা তারিখ পরিবর্তনের জন্য এজেন্সিতে গেলে জানানো হচ্ছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ফ্লাইট সূচি স্থিতিশীল হবে না।
জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে। যার ফলে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মোট ৫৪টি ফ্লাইট বাতিল হলো। এ ছাড়া শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত সাত দিনে ২২৮টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এতে করে দেশে এসে আটকা পড়েছেন অনেক প্রবাসী।
চট্টগ্রাম নগরীর প্রবাসী মঞ্জুর আলম ৬ মাসের ছুটিতে দেশে এসে পরিবারের সঙ্গে কিছুটা নিশ্চিন্ত সময় কাটানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। দুবাইয়ে কর্মরত এই প্রবাসীর ফেরার তারিখ ছিল ২৫ মার্চ। টিকিট কাটা থেকে শুরু করে সব প্রস্তুতিও শেষ হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হতে থাকে। এখন তিনি দুবাই ফিরে কর্মস্থলে যোগদান দিতে পারছেন না। এ নিয়ে তিনি নানা আশঙ্কা ও উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন ।
তিনি বলেন, কোম্পানিতে সময়মতো না ফিরতে পারলে সমস্যা হবে। বারবার ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে। এখন কী করব বুঝতে পারছি না।
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের মিজানুর রহমান নামে এক প্রবাসী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তুলে ধরেন সৃষ্টিকর্তার প্রতি আকুতি। তিনি লিখেন, “হে আল্লাহ! তুমি আমাকে সর্বোত্তম রিজিক দান করো। তোমার দেওয়া নেয়ামত দিয়ে ফের পরিক্ষায় ফেলো না আমায়। আমি অত্যন্ত দুর্বল ও ক্ষীণ বান্দা। বারবার কঠিন পরীক্ষায় পড়ার শক্তি আমার নেই। তুমি আমাকে সবর ও স্থিরতা দাও, এবং তোমার সন্তুষ্টির পথে অটল রাখো। আমিন”
সীতাকুণ্ডের মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম ছয় মাসের ছুটিতে দেশে এসে ভেবেছিলেন পরিবারের সঙ্গে কিছুটা নিশ্চিন্ত সময় কাটাবেন। দুবাইয়ে কর্মরত এই প্রবাসীর ফেরার তারিখ ছিল ৩ মার্চ। টিকিট কাটা, ব্যাগ গোছানো–সব প্রস্তুতিও ছিল শেষ। কিন্তু হঠাৎ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হতে থাকে। এখন তিনি না পারছেন দুবাই ফিরতে, না পারছেন নিশ্চিন্ত থাকতে। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে, চাকরি ঝুঁকির মুখে, আর প্রতিদিন বাড়ছে অনিশ্চয়তা।
এভাবে অসংখ্য প্রবাসী দেশে ছুটি কাটাতে এসে পড়েছেন বিপাকে। অপরদিকে সামনে পরিবারের সাথে ঈদ পালন করতে দেশে আসতে পারছেন না অনেকে। আবার পর্যটক এবং ব্যবসায়ীরাও পড়ছেন বিপাকে। তবে গতকাল দুবাই থেকে দেশে ফিরেছেন আটকে পড়া ১৮৯ জন বাংলাদেশি। এতে করে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কমেছে কিছু পরিবারের।
চট্টগ্রাম জেলা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম থেকে প্রতি বছর প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার শ্রমিক বিদেশে যান, যাদের বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যগামী। প্রতিষ্ঠানটির সহকারী পরিচালক মহেন্দ্র চাকমা জানান, সরকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখছে। বিদেশে কোনো ধরনের সমস্যায় পড়লে সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিদেশে যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে কোনো সমস্যা হলে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক থেকে সহায়তা পাওয়া যায়। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট—এই তিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদেশগামী যাত্রীদের জন্য এসব সহায়তা ব্যবস্থা রয়েছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও সংঘাতের কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে দৈনিক মজুরি ভিত্তিক কাজে নিয়োজিত অনেক প্রবাসী নিরাপত্তাজনিত কারণে ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। ফলে তাদের আয়ও বন্ধ হয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়তে পারে প্রবাসী পরিবারগুলোর ওপরও।