Sunday, 28 June 2026

উৎসবে নিত্যপণ্যের দাম কমিয়ে চট্টগ্রামে নতুন দৃষ্টান্ত

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ : 28 June 2026, 12:35

উৎসব এলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার প্রচলিত ধারা ভেঙে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ‘উৎসবে কমবে দাম, বাড়বে আনন্দ’ স্লোগানে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেয় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার নেতৃত্বে বাস্তবায়িত ‘ফেস্টিভ সেল’ কর্মসূচি বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি ব্যবসায়ী, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গণমাধ্যমের সমন্বয়ে নতুন সামাজিক ও ব্যবসায়িক সংস্কৃতির সূচনা করেছে।

কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন উপলক্ষে শনিবার (২৭ জুন) চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে আয়োজিত সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে বক্তারা জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞার দূরদর্শী নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে চট্টগ্রামে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তারা।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন। সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দীন বলেন, বাংলাদেশে সম্ভবত এই প্রথম ব্যবসায়ীদের পণ্যের দাম কমানোর জন্য সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে। এটি শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং নতুন একটি সংস্কৃতির সূচনা। তিনি বলেন, এ ধারা অব্যাহত থাকলে জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা এই উদ্যোগের পথিকৃৎ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

র‌্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেন, প্রতিটি ভালো কাজের পেছনে একজন উদ্যোগী মানুষের প্রয়োজন হয়। জেলা প্রশাসক সেই ভূমিকা পালন করেছেন বলেই সবাই মিলে আজ এই সফলতা উদযাপন করতে পারছি। তিনি এ উদ্যোগ দেশের সব জেলা ও উপজেলায় সম্প্রসারণের আহ্বান জানান।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার আমিরুল ইসলাম বলেন, জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে প্রশাসন ও ব্যবসায়ীরা জনকল্যাণে একসঙ্গে কাজ করেছেন, যা ভবিষ্যতের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ের পুলিশ সুপার চাউলাউ মারমা বলেন, বাজার শুধু আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল অংশগ্রহণই প্রকৃত পরিবর্তন আনতে পারে, আর জেলা প্রশাসকের উদ্যোগ সেই পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করেছে।

ডিজিএফআইয়ের উপ-পরিচালক নরুল হক বলেন, খাতুনগঞ্জে আদার সংকট নিরসনে জেলা প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ ও বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় প্রমাণ করেছে যে দায়িত্ববোধ থাকলে সংকট দ্রুত সমাধান সম্ভব।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার ইমরান হোসেন জানান, জেলা প্রশাসনের অনুরোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে ৪১টি কনটেইনারের আদা বাজারে আসতে সক্ষম হয় এবং বাজারে স্বস্তি ফিরে আসে।

কোস্ট গার্ড পূর্ব জোনের কমান্ডার আবু নেছার সালেহ আহমেদ বলেন, নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কোস্ট গার্ড নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করেছে এবং ভবিষ্যতেও জনস্বার্থে জেলা প্রশাসনের পাশে থাকবে।

আনসার ও ভিডিপির প্রতিনিধি ইসমাইল হোসেন বলেন, মানবিক জেলা প্রশাসক হিসেবে জাহিদুল ইসলাম মিঞা আগেই পরিচিত ছিলেন। এবার তিনি উৎসবকেন্দ্রিক মূল্যছাড়ের মাধ্যমে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক আবু হায়দার বলেন, বাজারদর নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার জন্য ব্যবসায়ীদের সম্মাননা প্রদান রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভালো কাজের স্বীকৃতি।

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন। একটি সুপারমার্কেটের কর্মকর্তা আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানান, তারা কোরবানিসংশ্লিষ্ট ৮৭টি পণ্যের মূল্য কমিয়েছেন। খুলশি মার্টের মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান ৮৩টি পণ্যে ৫ থেকে ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড় দিয়েছে।

সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ক্ষমতা কিংবা শক্তি প্রয়োগ করে কোনো ব্যবস্থা দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা যায় না। একটি সংস্কৃতি তখনই স্থায়ী হয়, যখন মানুষ সেটিকে মূল্যবোধ দিয়ে ধারণ করে।

তিনি বলেন, ‘ফেস্টিভ সেল’ শুধু পণ্যের মূল্য কমানোর উদ্যোগ নয়; এটি ব্যবসায়িক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও জনকল্যাণের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার প্রয়াস। চট্টগ্রাম দেশের ব্যবসা ও অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখান থেকে ইতিবাচক ব্যবসায়িক সংস্কৃতির সূচনা হলে তার প্রভাব সারা দেশেই পড়বে।

জেলা প্রশাসক জানান, নারায়ণগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে প্রথম তার মাথায় উৎসবকেন্দ্রিক মূল্যছাড়ের ধারণা আসে। পরে চট্টগ্রামে যোগ দিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকের মাধ্যমে ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়।

তিনি বলেন, উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উৎসব মানেই মূল্যছাড়, অথচ বাংলাদেশে উৎসব এলেই বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। সেই বাস্তবতা পরিবর্তনের লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অনুষ্ঠানের শেষে ‘ফেস্টিভ সেল’ কর্মসূচি সফল বাস্তবায়নে বিশেষ অবদান রাখায় ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, বিভিন্ন সংস্থা ও গণমাধ্যমকর্মীদের সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।

ভিডিও