বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

‘মাইয়াটা পানি নিতে বাইর হইছিল, গুলিটা চোখে লাগছে’

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ : ৮ মে ২০২৬, ০৮:৫১

‘আমার মাইয়া ঘর থেইকা বাইর হয় না প্রয়োজন ছাড়া । কাল রাতে আমার থেইকা সদাইয়ের টাকা নিয়া সে বাসায় চলে যায়। কিছুক্ষণ পর পানি নিতে বাইর হইছিল মাইয়াটা। এর মধ্যেই গুলি, চিৎকার চেঁচামেচি। ও তো ছোট, সরতে পারে নাই। চোখে গুলিটা লাইগা গেছে। আমার মেয়ের মত আর কোনো মেয়ের যেন এমনটা না হয়। এটাই আমি চায়।’

শুক্রবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছল ছল চোখে একবুক কষ্ট আর ক্ষোভ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন রিয়াজ আহমেদ। তিনি রৌফাবাদ বাঁশবাড়িয়া বিহারি কলোনিতে দুর্বৃত্তের মিসফায়ারিংয়ের শিকার গুলিবিদ্ধ রেশমির হতভাগ্য বাবা।

আসলে এর বেশি কিছু আর কিই-বা চাইবেন তিনি ? এই সমাজে এক শাক বিক্রেতার মেয়ের আর কতটুকুই বা নাগরিক অধিকার ? কোন কিছুতে জড়িত না থেকেও রেশমি নামের কিশোরীটি গুলিবিদ্ধ। সাপ্তাহিক ছুটির দিনের আগের রাত। ব্যস্ত জনপদ, ব্যস্ত মহানগর। ফ্রি স্টাইলে একটি জনপূর্ণ কলোনিতে প্রকাশ্যে গুলি চালাচ্ছে দুর্বৃত্তরা। ধাওয়া দিয়ে হাসান রাজু নামে একজনকে মাথায় গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে বেরিয়ে যাচ্ছে। তাদের মিসফায়ারিংয়ের কারণে নিষ্পাপ একটি কিশোরী মৃত্যুর প্রহর গুনছে। তাহলে এর থেকে আর বেশি কি চাওয়ারই বা থাকতে পারে রিয়াজ আহমেদদের মত নিম্নজীবী মানুষের ?

ঘটনার পর থেকে চমেকেই পড়ে রয়েছেন তিনি। মেয়েকে একনজর দেখতেও পারছেন না। ডাক্তাররা ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছেন না কাউকে।

এ ঘটনায় বিচার চান কিনা এমন প্রশ্ন করা হলে রিয়াজ বলে ওঠেন, ‘ডাক্তাররা চেষ্টা করতাছে। কিন্তু কিছু বলতে পারতেছে না। মেয়েটা কেমন আছে ? সে কি বেঁচে আছে, নাকি ….? একরাশ নিরবতা। আর কথা বলতে পারেননি রিয়াজ আহমেদ। কণ্ঠ আড়ষ্ট হয়ে আসে। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকার পর বলে উঠেন- ‘আমি কলোনিতে ভ্যানে কইরা শাক বেচি। গরীব মানুষ। কি বিচার চামু (চাইবো) কি আর বিচার হবে ?

চিকিৎসাধীন রেশমির বড় ভাই ফয়সাল আহমেদ জানান, রেশমি আমার ছোটবোন। ওকে আমার আম্মু সদাই করতে পাঠাইছিল। ও যখন গলিতে বের হইছে। তখনই গুলি শুরু হইছে। দুর্বৃত্তরা আমাদের গলি দিয়া ঢুকছে। গুলিটি আমার বোনের চোখ দিয়ে ঢুকে মাথা ভেদ করে পিছনে বের হওয়ার অবস্থা । ওর মগজ বের হয়ে গেছে। তবে গুলি ভেতরে রয়ে গেছে। ডাক্তাররা ৯৫ ভাগ আশা ছেড়ে দিয়েছেন। নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছে। দুর্বৃত্তরা বাইরে থেকে এসে আমাদের মা-বোনকে মেরে ফেলছে। এ ঘটনার বিচার চাই আমরা। ওরা তিন-চার জন ছিল দলে।

চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুর-অক্সিজেন সড়কের রৌফাবাদ থেকে আধা কিলোমিটার পশ্চিমে শহীদ মিনার এলাকার পাশে বাঁশবাড়িয়া বিহারি কলোনি। বৃহস্পতিবার রাতে এই কলোনিতে ঢুকে তিন-চারজনের একদল দুর্বৃত্ত হাসান রাজু নামের একব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করে। রাজু রাউজান থেকে বিহারি কলোনিতে তার বোনের বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন। রাজুকে গুলি করার সময় দুর্বৃত্তদের মিসফায়ারিংয়ে পড়ে চোখে গুলিবিদ্ধ হন রেশমি আক্তার।

আজ শুক্রবার স্কুল ছুটির দিন। কথা ছিল ছুটির দিনে বন্ধুদের সাথে মজা করবে, আড্ডা দেবে রেশমি। বিকালে খালার বাসায় বেড়াতে যাবে আম্মুর সাথে। কিন্তু সে আর হলো কই ? এখন সে হাসপাতালের বিছানায় নিথর হয়ে পড়ে আছে।

পূর্বতারা/ইউডি

ভিডিও