মসজিদের বড় চত্বরের ওপরে টাঙ্গানো বিশাল শামিয়ানার ছাউনি। ছা্উনির নিচে বিছানো লম্বা দস্তরখানায় বসে আছেন মুসল্লীরা। মাগরিবের আযানের সাথে সাথে ইফতার মুখে দিয়ে রোজা ভাঙ্গছেন তারা। প্রতিদিন ২ হাজার থেকে ৪ হাজার রোজাদার শরিক হচ্ছেন গণ-ইফতারে। ধনী-গরীব এক কাতারে ইফতারের আনন্দ ভাগাভাগি করছেন। এ যেন এক ইফতারের থালায় একাকার পবিত্র সিয়াম আর ভ্রাতৃত্ববোধ।
এ দৃশ্য চট্টগ্রাম নগরীর ঐতিহ্যবাহী আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের গণ-ইফতারের। সুদীর্ঘ ২৪ বছর ধরে প্রতি রমজান মাসে এখানে আয়োজন করা হচ্ছে গণ-ইফতার কর্মসূচি। এখানে কেউ দিচ্ছেন স্বেচ্ছাশ্রম। সদকায়ে জারিয়া হিসেবে আবার কেউ দিয়ে যাচ্ছেন নানান পণ্যসামগ্রী। এ আয়োজন বাবদ সরকারের কোনো সাহায্যই নেয় না মসজিদ কর্তৃপক্ষ। আন্দরকিল্লা জামে মসজিদের এই গণ-ইফতারের গল্প চট্টগ্রাম তথা বিশ্বময় ছড়িয়ে গেছে।
এত বিপুল সংখ্যক রোজাদারের ইফতারি তৈরিতে এখানে রীতিমত এক মহাযজ্ঞ চলছে। কিভাবে চলছে এই মহাযজ্ঞের আয়োজন ? কে বা কারা দান করছেন ইফতারি তৈরির উপকরণ ? তা কেউই জানেন না। দাতারা নিরবে নিভৃতে দান করে যাচ্ছেন সবকিছু, যেন বলতে সবার মানা।
এত বড় আয়োজন সম্পর্কে জানতে চাইলে মসজিদের খতিবের সহকারী হাসান মুরাদ বলেন, গণ-ইফতারের আয়োজন করা হচ্ছে ২০০১ সাল থেকে। মসজিদের খতিব সৈয়দ মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন তাহের জাবেরী আল-মাদানীর উদ্যোগেই এ আয়োজন শুরু হয়। এই আয়োজনে মসজিদ কর্তৃপক্ষের এক টাকাও খরচ হয় না। সবকিছু মানুষের দান থেকে হচ্ছে। যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী ছোলা,তেল,বেসন,ডাল, বেগুন,চিনি,লবণ,খেজুর,সেমাইসহ বিভিন্ন সামগ্রী দিয়ে যান। তবে কেউই নিজেদের নাম প্রকাশ করতে চান না। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মুসল্লী ইফতার করেন।
জানা গেছে, মসজিদের এই গণ-ইফতারে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে শ্রমিক, রিকশাচালক, শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি পেশাজীবীরা শরিক হন। পবিত্র মনে পবিত্র সিয়াম সাধনার অংশ হিসেবে তারা এখানে শরিক হন। সোয়াবের ভাগিদার হন। এ যেন এক ইফতারের থালায় মিশে থাকে এক অনন্য বন্ধন।
স্বেচ্ছাসেবক আবুল কালাম জানান, আমার জানামতে এখানে রান্নাবান্না থেকে শুরু করে ইফতার বিতরণ পর্যন্ত পুরো আয়োজনে জড়িত সবাই স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করেন। রমজান মাস এলে আমরা এখানে হাজির হই। মানুষের সেবার মাধ্যমে সোয়াব আদায় করার চেষ্টা করি।
জামালখান থেকে গণ-ইফতারে শরিক হওয়া মো. শফিউল্লাহ বলেন, প্রতিবছর আমি দুয়েক দিন এখানে ইফতার করি। এখানে এক কাতারে বসে ইফতার করার একটা সোয়াব আছে।
আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদটি ১৬৬৭ খ্রিষ্টাব্দে শায়েস্তা খাঁর ছেলে বুজুর্গ উমেদ খাঁ তৈরি করেছিলেন। মোগলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের স্মারক হিসেবে এই মসজিদটি তৈরি করা হয়েছিল। দিল্লি জামে মসজিদের আদলে এই মসজিদ তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে মসজিদের নানামুখী অবকাঠামো উন্নয়ন ও সংস্কার করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে মসজিদের কলেবর।