বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

হাসপাতালে এমপির ‘শক্তি প্রদর্শন’, রোগীদের নাভিশ্বাস

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৩৪

নেতা-কর্মীদের কোলাহলে ঢেকে যাচ্ছে রোগীর আর্তনাদ। চিকিৎসকের কক্ষ ফাঁকা, প্রটোকলে ব্যস্ত সবাই। ওয়ার্ডের দরজায় সেলফির ঝলকানি, আর ভেতরে নিঃশব্দে বাড়ছে রোগীদের উৎকণ্ঠা। অপেক্ষা আর উৎকণ্ঠায় নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। বলছি, চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সোমবারের চিত্রের কথা।

চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম হাসপাতাল পরিদর্শনে এলে তাঁর সঙ্গে থাকা শত শত নেতা-কর্মীর বিশাল বহরে হাসপাতালটি যেন মুহূর্তেই এক রাজনৈতিক জনসভায় পরিণত হয়। আর এই প্রটোকলের ভিড়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হন সাধারণ রোগীরা। জনসেবার নামে জনভোগান্তি— এমন অভিযোগ উঠেছে এ সংসদ সদস্যের পরিদর্শন ঘিরে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১২টার দিকে সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে হাসপাতালে প্রবেশ করলে মূল ফটক থেকে শুরু করে বহির্বিভাগ ও ওয়ার্ড পর্যন্ত মানুষের ঢল নামে। টিকিট কাউন্টারের সামনে দীর্ঘ লাইন থমকে যায়। চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের অনেকেই ভিড় ঠেলে সামনে এগোতে ব্যর্থ হন।

একজন বৃদ্ধ রোগীর স্বজন বলেন, ‘আমরা সকাল থেকে বসে আছি। হঠাৎ এত লোক ঢুকে পড়ায় আর এগোতে পারছি না। রোগী কষ্ট পাচ্ছে, কিন্তু কারো দিকে তাকানোর সময় নেই।’

হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এমপির সফর ঘিরে চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের বড় অংশ প্রটোকল ব্যবস্থাপনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে নিয়মিত সেবা কার্যক্রমে সাময়িক বিঘ্ন ঘটে। বিশেষ করে বহির্বিভাগে রোগীদের চাপ বেড়ে যায়।’

ওয়ার্ডের ভেতরেও দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। ভর্তি রোগীদের কক্ষে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রবেশ, ছবি তোলা ও সেলফি তোলার দৃশ্য অনেকের কাছে বিব্রতকর মনে হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, হাসপাতাল একটি সংবেদনশীল স্থান, এখানে শৃঙ্খলা ও নীরবতা জরুরি।

আনোয়ারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ডা. মাহাতাব উদ্দীন চৌধুরী বলেন, ‘আসলে এটা নিয়ে আমার তো কিছু করার নাই, উনি স্থানীয় এমপি। হাসপাতালে সামান্য অসুবিধা হলেও মেনে নেওয়া ছাড়া আর কিছু করার নাই। তবে তিনি হাসপাতালে কী কী সমস্যা আছে, আমাকে তার নোট দিতে বলেছেন। ভিড়ের কারণে রোগীদের অসুবিধা প্রসঙ্গে এই কর্মকর্তা স্বীকার করে বলেন, এত ভিড়ে অসুবিধা হওয়াটাই স্বাভাবিক।’

এদিকে জনপ্রতিনিধির এই আকস্মিক ও বিশাল বহরের পরিদর্শন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

মোহাম্মদ রেজাউল করিম সাজ্জাদ নামের এক ব্যক্তি ফেসবুকে এমপির পরিদর্শনের ছবি যুক্ত করে হতাশা প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘শত শত নেতা-কর্মী নিয়ে আনোয়ারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম। এতে কিছুক্ষণ মেডিকেলে ভর্তি থাকা রোগীরা দুর্ভোগে ভোগেন। পরিদর্শন হতে হবে সিঙ্গেল। যাতে রোগী ও দর্শনার্থীদের সাথে খোলামেলা কথা বলতে পারে এমপি। মেডিকেলের যাবতীয় দুর্নীতি, অনিয়মের কথা ঠিকমতো শুনতে পারে। এখন পরিদর্শনটা এক ধরনের লোক দেখানো হয়ে গেছে।’

সেই পোস্টের নিচে শারমিন কলি নামের একজন মন্তব্য করেছেন, ‘আমাদের দেশের এত সময় যে তারা সারাজীবন শুধু নেতার পেছনে দৌড়ায়, এ দৌড়ানো যত দিন বন্ধ হবে না, তত দিন দেশ থেকে ভালো কিছু আশা করা বোকামি।’ মোহাম্মদ সাদিক খান নামের আরেকজন মন্তব্য করেছেন, ‘১৭ বছর পর ক্ষমতা পাইছে, সেটা দেখাতে হবে না?’

ভিডিও