‘আমরা সেহরি খেয়ে ফেলেছিলাম। আমি পানি খেয়ে রুমে ডুকতেই পেছন থেকে বিস্ফোরণ হয়। ঘরের ভেতর থেকে কোন স্থান থেকে বিষ্ফোরণ হয়েছে। ঘরের সব জানালায় নেট লাগানো। আর কিছু বলতে পারি না।…’ আগুনে পোড়া শরীরে হাসপাতালের বেডে শুয়ে কাতর কন্ঠে এমনটাই জানান চট্টগ্রামের হালিশহরে বিষ্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধ একজন।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) ভোর ৪টা ৩১ মিনিটে হালিশহর এইচ ব্লকে হালিম মঞ্জিল নামের ভবনের তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে এই দুর্ঘটনা ঘটে। এতে একই পরিবারের তিন শিশুসহ ৯ জন দগ্ধ হয়েছেন। তাদের সবার অবস্থা আশঙ্কাজনক। দগ্ধরা হলেন- আয়েশা (৪), আনাছ (৭), আইমান (১০), শাওন (১৭), সাখাওয়াত (৪৬), শিপন (৩২), সুমন (৪০), রানী (৪০) ও পাখি (৩৫)।
সরজমিনে দেখা যায়, বিস্ফোরণের পর আগুনে পুড়ে গেছে ঘরের জিনিসপত্র। রান্না ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তৈজসপত্র। বিষ্ফোরণ ও আগুনের পোড়া গন্ধ পুরো ফ্ল্যাটে। ডাইনিং টেবিলে প্লেটে দেখা যায় ভাত। মনে হয় কেউ সেহরি খাওয়া শেষে করেছেন আবার হয়তো কেউ ছিলেন শেষের পর্যায়ে।
পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন শামীমা আক্তার তমা নামে এক নারী। সেখানে তিনি একটি বিউটি পার্লার পরিচালনা করেন। তিনি জানান, বিস্ফোরণের সময় তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে যায় তার। এরপর তিনি দেখেন ঘরের দরজা উড়ে গিয়ে তার পার্লারের আলমারি ও শোকেসের গ্লাস ভেঙেছে। তিনি বলেন, ওই বাসাটি থেকে চিৎকার শুনে দরজায় গিয়ে দেখি তারা দৌঁড়ে ঘর থেকে বের হচ্ছিলেন। আর ঘরের ভেতর আগুন জ্বলছিল। বের হওয়ার সময় তাদের শরীরে আগুনও দেখা গেছে।
জসীম উদ্দিন নামে অপর একজন বলেন, সেহেরির জন্য ভোরে আমরা উঠেছিলাম। আনুমানিক সাড়ে ৪টার দিকে বিকট শব্দে আমাদের ঘরের মূল দরজাসহ জানালার গ্লাসগুলো ভেঙে যায়। এমনকি ঘরের সিলিং ফ্যান বাঁকা হয়ে যায় ও ফ্রিজও পড়ে যায়।
ভবনটির মালিক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী দিদারুল আলমের পরিবার থাকে হালিশহরের জি ব্লকে। দিদারুলের দাবি, ভবনের গ্যাস লাইনে কোনো ধরনের ধরনের ত্রুটি ছিল না। সব সময় তারা সেগুলো মেরামত করে রাখেন।
ভবনের তত্ত্বাবধায়ক মো. সম্রাটের বলেন, মূল ফটকের পকেট গেইট খুলে দিয়ে সেহরি করে শুতে গিয়েছিলাম। হঠাৎ বিস্ফোরণের পর দেখি উপরের থেকে ওই ঘরের লোকজন নেমে আসছে। তাদের সবাই দগ্ধ হয়েছিলেন। বিস্ফোরণের শব্দ বিকট ছিল। মনে হচ্ছে ভবনসহ ভেঙে পড়ে যাবে।
জানা গেছে, গ্যারেজ মালিক সাখাওয়াত হোসেন ওই ফ্ল্যাটটি ভাড়া নিয়েছিলেন দেড় বছর আগে। সেখানে তিনি দুই সন্তান, স্ত্রী এবং তার গ্যারেজের এক কর্মচারীসহ পাঁচজন থাকেন। কদিন আগে তার ছোট ভাই পরিবার নিয়ে তার বাসায় আসেন ডাক্তার দেখাতে।
এদিকে দগ্ধ নয়জনের সবার অবস্থাই ‘আশঙ্কাজনক’ বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের চিকিৎকরা। দুর্ঘটনার পরপরই তাদের হাসপাতলে ভর্তি করা হলেও দুপুরে বার্ন ইউনিটের রেজিস্ট্রার আশফাকুল আতিক বলেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য ৯ জনকেই ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
ভর্তির পর হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রধান চিকিৎসক রফিক উদ্দিন আহমেদ বলেন, দগ্ধদের সকলেরই শ্বাসতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের সকলের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। তাদের মধ্যে রানী, পাখি ও সাখাওয়াতের শরীর শতভাগ পুড়ে গেছে। এছাড়া শিপনের ৮০, সুমন ও শাওনের ৪৫, আইমান ও আনাছের ২৫, আয়েশার শরীরের ২০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।
চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের (জোন-১) উপসহকারী পরিচালক আলমগীর হোসেন বলেন, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে রান্নাঘরে গ্যাস জমে ছিল। চুলার আগুন ধরাতে গিয়ে এ বিস্ফোরণ হয়ে আগুন ধরে যায়। এছাড়া ভবনের দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত প্রত্যেকটি ফ্ল্যাটের দরজা জানালা ভেঙে গেছে।