সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনটিকে জামায়াতে ইসলামীর ঘাঁটি বলা হয়। নানা সময়ে এখানে অন্য দলের প্রার্থীরা জয়লাভ করলেও এ আসনে জামায়াতে ইসলামী ঘুরে ফিরে চেয়ারে বসেছে। বরাবরের মতই শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও জামায়াতে ইসলামীর শাহজাহান চৌধুরী ১ লাখ ৭২ হাজার ৬১ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। দীর্ঘ ১৩ বছর পর সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় আবার জয় পেয়েছে জামায়াতে ইসলাম।
স্থানীয় বাসিন্দা ও দলীয় নেতা–কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দক্ষিণ চট্টগ্রামের মধ্যে সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনে জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক শক্ত অবস্থান রয়েছে। বিএনপি বা অন্য দলগুলোর সাংগঠনিক তৎপরতা ততটা সক্রিয় নয়। তাদের ওয়ার্ড বা থানা পর্যায়ের কমিটি থাকলেও তা নিষ্ক্রিয়। কর্ণেল অলি আহমদ যখন বিএনপিতে ছিলেন তখন এ আসনে রমরমা ব্যাপার ছিল। ১৯৯৬ সালে কর্ণেল অলি এখানে সাংসদও নির্বাচিত হয়েছিলেন। অলি আহমদ এলডিপি গঠন করার পর নেতৃত্ব হারা হয়ে যায় সাতকানিয়া–লোহাগাড়া বিএনপি। বিএনপির কিছু নেতা–কর্মী এলডিপিতে চলে আসে। আর কিছু নেতাকর্মী জামায়াতে যোগ দেন। অনেকে আবার নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। ২০০৮ সালের নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে এখানে বিএনপি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দেয়। ৫ আগষ্ট পরবর্তী সময়ে সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় আবার দলবদলের হিড়িক পড়ে। অনেকেই আওয়ামী লীগ ছেড়ে কেউ জামায়াত বা কেউ কেউ বিএনপিতে চলে আসে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনে শাহজাহান চৌধুরী ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী অলি আহমদের কাছে পরাজিত হন। ২০০১ সালে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করলেও উভয় দল পৃথকভাবে নির্বাচন করে এবং তাতে শাহজাহান চৌধুরী বিজয়ী হন। ২০০৮ সালে এই আসনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির আ ন ম শামসুল ইসলাম নির্বাচিত হন। ২০১৪ ও ২০১৮ সালে এ আসনে আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভী আওয়ামী লীগের সাংসদ হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে আবু রেজা নদভী আওয়ামী লীগের টোকেনে নির্বাচন করেন। তবে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুল মোতালেবের কাছে পরাজিত হন। স্থানীয়দের মতে, ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নদভীকে ঠেকাতে এ আসনে জামায়াত-বিএনপি একযোগে আবদুল মোতালেবের পক্ষে কাজ করেছিল। আবার নদভী বিরোধী অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীও ছিলেন আবদুল মোতালেবের পক্ষে।
এবার ভিন্ন দৃশ্যপটে ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠেছে সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায়। একদিকে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি অন্যদিকে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা। তারওপর জামায়াত প্রার্থী ও বিএনপি প্রার্থীর মধ্যে অসম পার্থক্য। শাহজাহান চৌধুরী এলাকায় পুরোনো পরিচিত পরীক্ষিত মুখ। দলের একজন হেভিওয়েট প্রার্থী। এদিকে বিএনপি প্রার্থী লোহাগাড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক নাজমুল মোস্তফা এলাকায় নতুন মুখ। লাইটওয়েট প্রার্থী। তবে এ নির্বাচনে তিনি জামায়াতের শাহজাহান চৌধুরীর কাছে মাত্র ৪৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন। তাঁর প্রাপ্তভোট ১ লাখ ২৭ হাজার ২৫টি।
দীর্ঘ ১৩ বছর পর এ আসনে জামায়াত ইসলামীর প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী তৃতীয়বারের মত বিজয়ী হয়ে দলের পতাকা উড়াচ্ছেন।
এ ব্যাপারে সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনের নবনির্বাচিত সাংসদ শাহজাহান চৌধুরী বলেন, এলাকার আপামর জনসাধারণ,নেতাকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। আমার জন্য তারা নিরলস কাজ করে গেছেন। তারা পাশে ছিলেন বলে নির্বাচনে জয় এসেছে। ১৯৯১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে সাতকানিয়া–লোহাগাড়াবাসীর সুখে–দুঃখে আছি আমি। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের আমলে জুলুম–নির্যাতনের শিকার হওয়া এলাকাবাসীর পাশে ছিলাম। ৫ আগস্টের পর থেকে সশরীর তাদের পাশে ছিলাম। তাই লোকজন আমাকে বেছে নিয়েছেন। ভবিষ্যতেও আমি তাদের জন্য নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে কাজ করে যাব।’
এদিকে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ায় বিএনপির নেতা-কর্মী এবং তাদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে জামায়াত হামলা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন পরাজিত প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিন। গতকাল রোববার সন্ধ্যা সাতটার দিকে লোহাগাড়ার একটি রেস্টুরেন্টে সংবাদ সম্মেলন করে এই অভিযোগ তুলেন।
নাজমুল মোস্তফা আমিন বলেন, নির্বাচনের পর সাতকানিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির সাধারণ কর্মী ও সমর্থকদের বাড়িতে ২০টির বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় তাঁদের ঘরবাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। এসব হামলায় বিএনপির অন্তত ২৫ জন কর্মী-সমর্থক আহত হয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীর লোকজন এই হামলার সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করেন তিনি।