,

 

এ বসন্তে ভালোবাসারও উপলক্ষ থাকা চাই

আশরাফুন নুর

প্রকাশ : 14 February 2026, 01:45
ছবি— রনী দে, নিজস্ব আলোকচিত্রী

পহেলা ফাল্গুনের সকাল মানেই নরম রোদ, হালকা উষ্ণতা আর আগুনরাঙা পলাশে রাঙা প্রকৃতি। ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে প্রাণ জেগে ওঠে নতুন করে। আর যখন সেই দিনটি মিলে যায় বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের সঙ্গে, তখন আবেগ আর উৎসব যেন এক সুতোয় গাঁথা হয়ে ওঠে। ১৪ ফেব্রুয়ারি— একই দিনে বসন্তবরণ ও ভালোবাসা দিবস। দিনটি এখন বাঙালির সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডারের এক বিশেষ আয়োজন।

প্রতি বছর ফাল্গুনের প্রথম দিন ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করে বাঙালি। আর ১৪ ফেব্রুয়ারি সারা বিশ্বে পালিত হয় বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। বাংলা বর্ষপঞ্জি সংস্কারের ফলে কয়েক বছর ধরে এই দুই দিন একসূত্রে গাঁথা। ফলে বসন্তের রঙিন আবহে ভালোবাসার প্রকাশ পেয়েছে নতুন মাত্রা।

নগরীর বিনোদনকেন্দ্র, পার্ক, ক্যাম্পাস কিংবা ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম সিআরবি শিরীষতলা— সবখানেই তরুণ-তরুণীদের ভিড়। বাসন্তী রঙের শাড়ি, খোঁপায় ফুল, গালে আল্পনা; তরুণদের পোশাকেও বাসন্তী ছোঁয়া। কোকিলের কুহুতান, শিমুল-পলাশের রঙ আর গানের সুরে বসন্ত যেন প্রেমেরই আরেক নাম হয়ে ওঠে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বসন্তের শুভেচ্ছা আর ভালোবাসার বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। ফুল, চিঠি, ছোট উপহার কিংবা একসঙ্গে সময় কাটানো— সবকিছুই হয়ে ওঠে অনুভূতির ভাষা।

বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের পেছনে রয়েছে ইতিহাস ও কিংবদন্তি। প্রাচীন রোমে ভ্যালেন্টাইন নামে এক চিকিৎসকের কাহিনি প্রচলিত আছে। খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের অপরাধে রোম সম্রাট ক্লডিয়াস দ্বিতীয়–এর আদেশে ২৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মৃত্যুর আগে তিনি এক অন্ধ তরুণীকে চিঠি লিখে যান— ‘ইতি তোমার ভ্যালেন্টাইন’। পরে ৪৯৪ খ্রিস্টাব্দে পোপ সেন্ট জেলাসিউস প্রথম ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইন্স ডে হিসেবে ঘোষণা করেন। সেই থেকে দিনটি বিশ্বব্যাপী ভালোবাসার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

যদিও একসময় এটি পাশ্চাত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, এখন বিশ্বের নানা দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়।

গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সঙ্গে সমন্বয় করতে ২০১৫ সালে বাংলা একাডেমি–এর উদ্যোগে বর্ষপঞ্জি সংস্কার করা হয়। কমিটির সভাপতি ছিলেন শামসুজ্জামান খান। এই সংস্কারের ফলে ফাল্গুনের তারিখে পরিবর্তন আসে এবং ১৪ ফেব্রুয়ারি এখন স্থায়ীভাবে পহেলা ফাল্গুন হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে।

এ পরিবর্তনের কারণে ঐতিহাসিক দিনগুলোর বাংলা তারিখেও সামান্য হেরফের হয়েছে। যেমন, শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের বাংলা তারিখে পরিবর্তন এসেছে। তবে উদ্দেশ্য একটাই— তারিখের স্থায়ী সমন্বয়।

মা-বাবা, ভাই-বোন, বন্ধু, স্বামী-স্ত্রী কিংবা প্রেমিক-প্রেমিকা— সব সম্পর্কের ভিত্তিই ভালোবাসা। কেউ কেউ এ দিবসকে বাণিজ্যিক বলে সমালোচনা করেন। কিন্তু ভালোবাসা দিবস আসলে একটি প্রতীকী উপলক্ষ— সারা বছরের অনুভূতিকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার দিন।

প্রতিটি অনুভূতির যেমন প্রতীক থাকে, ভালোবাসারও একটি দিন থাকতে পারে। তাতে ক্ষতি কী? বরং একটি দিন সম্পর্ককে নতুন করে ভাবতে শেখায়, অভিমান ভাঙতে উদ্বুদ্ধ করে, যত্ন নিতে মনে করিয়ে দেয়।

বসন্ত পুরোনো ঝরিয়ে নতুনের আহ্বান জানায়। শুষ্ক ডালে নতুন পাতা, রুক্ষতায় রঙের ছোঁয়া— সবই পুনর্জাগরণের প্রতীক। ভালোবাসাও তেমনি ক্ষত মুছে নতুন করে শুরু করার শক্তি দেয়।

আজকের ভালোবাসা দিবস শুধু আমদানি করা উৎসব নয়; এটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। ফুলের তোড়া, হাতে লেখা চিঠি কিংবা সাদামাটা একসঙ্গে হাঁটা— সবই হয়ে উঠেছে ভালোবাসার ভাষা।

ভালোবাসার জন্য আলাদা দিন লাগে না— তবুও একটি দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সম্পর্ককে যত্নে রাখতে হয়। তাই বসন্তে ভালোবাসারও একটি উপলক্ষ থাকা চাই। কারণ ভালোবাসাই মানুষের বেঁচে থাকার শক্তি, সমাজের বন্ধন, জীবনের অনিবার্য সত্য।

ভিডিও