চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ চ্যানেলে ফেরি চলাচল শুরুর পর ক্ষতিগ্রস্ত জেলে পরিবারের জন্য সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সড়ক পরিবহন, বিদ্যুৎ ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের নির্দেশে এসব সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়।
শনিবার (২৯ নভেম্বর) সন্দ্বীপ উপজেলা কমপ্লেক্সে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ৩৪টি জেলে পরিবারকে নগদ আর্থিক সহায়তা ও খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হয়। প্রতিটি পরিবার পেয়েছে ২৫ হাজার টাকা করে নগদ অর্থ এবং ৪০ কেজি চাল। মোট বিতরণ করা হয়েছে ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও ১ দশমিক ৩৬ টন চাল।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নবাগত চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন। এ সময় সন্দ্বীপের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মংচিংনু মারমাসহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, ‘জ্ঞান–বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে জেলেদের মাছ ধরার পদ্ধতি আধুনিকায়ন করতে হবে। পাশাপাশি ছেলে–মেয়েদের শিক্ষা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করে পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে।’
উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘স্যার বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, পড়িয়েছেনও। তাঁর বই বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো হয়। তিনি এই ভূমির সন্তান; আপনাদের সন্তানরাও অক্ষম নয়। তাদেরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।’
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘গত ২৪ তারিখে উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান স্যার আমাকে ফোন করে সন্দ্বীপের জেলে ভাইদের সমস্যার কথা জানান। ফেরি চলাচলের কারণে তারা মাছ ধরতে পারছেন না, জাল ফেলতে পারছেন না— এমন খবর পেয়ে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিই।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইউএনওর মাধ্যমে জানতে পারি— চ্যানেলের জাল অপসারণের ফলে ৩৪ জন জেলে মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন। তাই আইনের মধ্য থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করে প্রত্যেক জেলে ভাইকে ২৫ হাজার টাকা ও ৪০ কেজি চাল বরাদ্দ দিয়েছি। ২৫ তারিখেই জিও অর্ডার জারি করা হয়।’
ডিসি আরও বলেন, ‘আমাদের মাছ একটি সম্পদ। এই সম্পদ রক্ষায় কখনো কখনো আমরা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ি। ভবিষ্যতেও যদি আপনাদের কোনো সহায়তার প্রয়োজন হয়, জীবনমান উন্নয়নের জন্য যদি কোনো দাবি থাকে— আমরা তা শোনার জন্যই এখানে এসেছি।’
তিনি দায়িত্ব গ্রহণের অল্পকিছুদিনের মধ্যেই জেলেদের ক্ষতির বিষয়টি জেনে দ্রুত সহায়তার ব্যবস্থা করার কথা উল্লেখ করেন এবং ভবিষ্যতেও সরকারি সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন।
হারামিয়া ইউনিয়নের হরি দাসের ছেলে রতি দাস বলেন, ‘ডিসি স্যার আমাদের সমস্যাগুলো নিজের মুখে শুনলেন। আমাদের সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার কথা বললেন এবং ভবিষ্যতেও সরকারি সহায়তা থাকবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন। তাঁকে খুব ভালো মানুষ মনে হয়েছে।’
উল্লেখ্য, সন্দ্বীপ–বাঁশবাড়িয়া নৌ–রুটে চলতি বছরের ২৪ মার্চ ফেরি সার্ভিসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। ফেরির নিরাপদ ও সুষ্ঠু চলাচল নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে চ্যানেল এলাকায় সাময়িকভাবে মাছ ধরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং স্থায়ী জাল অপসারণ করা হয়।
এর ফলে সন্দ্বীপের সনাতন ধর্মাবলম্বী জেলে সম্প্রদায়ের বহু পরিবার জীবিকার প্রধান উৎস হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হয়। প্রায় আট মাস ধরে তারা চরম অনিশ্চয়তায় দিন পার করছিলেন।
মানবিক পরিস্থিতি বিবেচনায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শনিবারের অনুষ্ঠানে মোট ৩৪ জন ক্ষতিগ্রস্ত জেলেকে সরকারি সহায়তা প্রদান করা হয়।সহায়তা পেয়ে জেলেরা জানান— এই সহায়তা তাদের পরিবারকে তাৎক্ষণিক সংকট থেকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে— ফেরি চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং জেলে পরিবারসহ স্থানীয় জনগণের জীবিকা সুরক্ষায় ভবিষ্যতেও সব ধরনের মানবিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।