একটানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যায় কক্সবাজারের মৎস্য খাত ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। জেলার প্রায় চার হাজার পুকুর ও ঘের তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে কোটি কোটি টাকার মাছ, চিংড়ি, পোনা ও পোস্ট লার্ভা (পিএল)। এতে শত শত মাছচাষি সর্বস্বান্ত হওয়ার পাশাপাশি জেলার সামগ্রিক মাছ উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জেলা মৎস্য বিভাগের প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যায় জেলার ৩ হাজার ৯১৮টি পুকুর ও ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মোট ক্ষতিগ্রস্ত জলাশয়ের পরিমাণ ৫ হাজার ২৫৪ একর। এতে ৭৬৮ জন মৎস্যচাষি সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সব মিলিয়ে মৎস্য খাতে প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্যার পানিতে ভেসে গেছে ১ হাজার ৯৭ মেট্রিক টন বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, ৩৮৫ মেট্রিক টন চিংড়ি, ৩ লাখ ৫৬ হাজার পোনা এবং ২২১ লাখ পিস পোস্ট লার্ভা (পিএল)। এর মধ্যে মাছের ক্ষতির পরিমাণ ১৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা, চিংড়িতে ১২ কোটি ৬২ লাখ টাকা, পোনায় ৫ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং পিএলে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উখিয়া উপজেলা। সেখানে ৭৩০টি পুকুর ও ঘের, প্রায় ২ হাজার একর জলাশয় এবং ১৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকার মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেসে গেছে ৬৫২ মেট্রিক টন মাছ, ১৬২ মেট্রিক টন চিংড়ি, বিপুল পরিমাণ পোনা ও পিএল। জেলার মোট ক্ষতির প্রায় এক-তৃতীয়াংশই হয়েছে এই উপজেলায়।
উখিয়ার রাজাপালং এলাকার মাছচাষি মোহাম্মদ আলম বলেন, ঋণ নিয়ে মাছ চাষ করেছিলাম। বন্যার এক রাতেই সব শেষ হয়ে গেছে। মাছ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা ছিল, এখন সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারের জরুরি সহায়তা না পেলে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না।
মহেশখালী, যেখানে ১০৫টি পুকুর ও ১ হাজার ৯৬৫ একর জলাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। চকরিয়ায় ক্ষতির পরিমাণ ৬ কোটি ৩ লাখ টাকা, মাতামুহুরীতে ৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, টেকনাফে ৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা এবং কক্সবাজার সদরে ৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এছাড়া পেকুয়ায় ২ কোটি ১০ লাখ, ঈদগাঁওয়ে ১ কোটি ৫ লাখ এবং রামুতে ৪২ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
মহেশখালী উপজেলার মৎস্যচাষি শরীফুল আলম বলেন, অধিকাংশ পুকুরের বাঁধ ভেঙে মাছ পানির সঙ্গে বেরিয়ে গেছে। কোথাও পুকুর কাদায় ভরে গেছে, আবার অনেক স্থানে পানির গুণগত মান নষ্ট হওয়ায় এখনই নতুন করে পোনা ছাড়া সম্ভব হচ্ছে না। যারা ব্যাংক বা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে মাছ চাষ করেছিলেন, তাদের পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি সংকটপূর্ণ।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের মুখপাত্র আবিদ আহসান সাগর বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের দ্রুত পুনর্বাসন, ভর্তুকি মূল্যে পোনা ও মাছের খাদ্য বিতরণ, স্বল্পসুদে ঋণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর-ঘের পুনঃসংস্কারে সরকারি সহায়তা জরুরি। তা না হলে চলতি বছরের ক্ষতির প্রভাব আগামী মৌসুমের মাছ উৎপাদন ও স্থানীয় বাজারে মাছের সরবরাহের ওপরও পড়বে।
কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে।
পূর্বতারা/ইউডি