চট্টগ্রাম নগরীতে ডেঙ্গুর ঝুঁকি উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। স্বাস্থ্য বিভাগের সাম্প্রতিক জরিপে নগরীর ১৮টি ওয়ার্ডের প্রায় ২৭ শতাংশ বাড়িতে ডেঙ্গুর বাহক এইডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের পানির পাত্রের ৩৩ শতাংশের বেশি স্থানে লার্ভার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এ অবস্থায় নগরীর আটটি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
জানা গেছে, স্বাস্থ্য বিভাগের চট্টগ্রাম দপ্তরের উদ্যোগে গত ৮ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত ‘ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের বাহক এইডিস মশার সার্ভে’ পরিচালিত হয়। বিভাগীয় কীটতত্ত্ববিদ মো. মফিজুল হক শাহর নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি দল জরিপটি সম্পন্ন করে। বুধবার সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কাছে জমা দেওয়া হয়।
জরিপে নগরীর ৪১ ওয়ার্ডের মধ্যে ১৮টি ওয়ার্ডের ৩৭০টি বাড়ি পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ৯৯টি বাড়িতে এইডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়, যা মোট বাড়ির প্রায় ২৭ শতাংশ। এছাড়া পরীক্ষা করা ৩৪৫টি কনটেইনারের মধ্যে ১১৪টিতে লার্ভা শনাক্ত হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি লার্ভা পাওয়া গেছে প্লাস্টিকের বালতি, মগ, গামলা, ড্রাম, বাটি ও কৌটার মতো পাত্রে। এছাড়া পানির ট্যাংক, নির্মাণাধীন ভবন, আন্ডারগ্রাউন্ড ফ্লোর, লিফট হোল, টিনের ক্যান এবং পরিত্যক্ত যানবাহনেও লার্ভার উপস্থিতি মিলেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাউজ ইনডেক্স ৫ শতাংশের নিচে এবং কনটেইনার ইনডেক্স ২০ শতাংশের মধ্যে থাকলে তা স্বাভাবিক ধরা হয়। কিন্তু চট্টগ্রামে হাউজ ইনডেক্স স্বাভাবিক মাত্রার পাঁচ গুণের বেশি এবং কনটেইনার ইনডেক্স নির্ধারিত সীমার চেয়ে ১৩ শতাংশ পয়েন্ট বেশি পাওয়া গেছে।
জরিপের ভিত্তিতে ১০ নম্বর উত্তর কাট্টলী, ৩ নম্বর পাঁচলাইশ, ২ নম্বর জালালাবাদ, ১৭ নম্বর পশ্চিম বাকলিয়া, ১৯ নম্বর দক্ষিণ বাকলিয়া, ৩৯ নম্বর দক্ষিণ হালিশহর, ৩৪ নম্বর পাথরঘাটা এবং ৩২ নম্বর আন্দরকিল্লা ওয়ার্ডকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিভাগীয় কীটতত্ত্ববিদ মো. মফিজুল হক শাহ বলেন, বর্ষা মৌসুমে তিন দিনের বেশি সময় পানি জমে থাকলে সেখানে এইডিস মশার বংশবিস্তার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। জরিপ অনুযায়ী পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও এখনও তা ভয়াবহ আকার ধারণ করেনি। তবে মশার বিস্তার রোধে নাগরিকদের সচেতনতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
জরিপে শনাক্ত লার্ভার মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ ছিল এইডিস ইজিপটাই এবং ২০ শতাংশ এইডিস অ্যালবোপিকটাস প্রজাতির।
প্রতিবেদনে বাড়িঘর ও কর্মস্থল পরিষ্কার রাখা, অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক কনটেইনার অপসারণ, বহুতল ও নির্মাণাধীন ভবনে নজরদারি বৃদ্ধি এবং সময়মতো লার্ভিসাইড ও কীটনাশক প্রয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সিটি করপোরেশনকে অবহিত করা হয়েছে। অন্যদিকে সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন জানিয়েছেন, যেসব বাড়ি বা স্থাপনায় মশার লার্ভা পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
প্রসঙ্গত, চলতি জুন মাসের প্রথম ২৫ দিনে চট্টগ্রামে ৮৫ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন, যা চলতি বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা মে মাসের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। চলতি বছর এখন পর্যন্ত জেলায় ২৬১ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন এবং একজনের মৃত্যু হয়েছে।