সকাল গড়িয়ে দুপুর। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের করিডোরে অপেক্ষমাণ মানুষের চোখে জমে থাকা নীরব প্রত্যাশা—কেউ চিকিৎসার খরচ জোগাতে না পেরে, কেউ সংসারের টানাপোড়েনে দিশেহারা। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সাপ্তাহিক গণশুনানির দিনে জেলার অভিভাবকের ভূমিকায় সবার কথা শোনেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
চট্টগ্রাম নগরীর পত্রিকার হকার জামাল উদ্দিন নিয়মিত জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে পত্রিকা সরবরাহ করেন। পাঁচ সদস্যের পরিবারে স্ত্রী ও তিন সন্তান—একজন কলেজে, অন্য দুজন স্কুলে পড়ে। স্বল্প আয়ে সংসার চালানো আর সন্তানদের শিক্ষাব্যয় মেটানো ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। গণশুনানিতে তিনি জানান, সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে। তার কথা ধৈর্য নিয়ে শোনেন জেলা প্রশাসক এবং আশ্বস্ত করেন—শিক্ষাজীবন থেমে যাবে না।
চান্দগাঁও থানার শহীদপাড়া এলাকার মৃত আবদুল হাকিকের পুত্র মো. রফিক (৭৬) দীর্ঘদিন ধরে নানা জটিল রোগে ভুগছেন। অভাবের কারণে নিয়মিত চিকিৎসা সম্ভব হচ্ছে না। কাঁপা কণ্ঠে তিনি ওষুধ কেনার অক্ষমতার কথা জানালে জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার দিকনির্দেশনাও প্রদান করেন।
চান্দগাঁও এলাকার নুরুল আলমের মেয়ে সমাজসেবক সুমি আক্তার গত এক দশক ধরে নানা রোগে আক্রান্ত। উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়ার পরামর্শ মিললেও অর্থাভাবে সেই পথ বন্ধ। বিষয়টি জানার পর জেলা প্রশাসক তার পাশে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেন এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের নির্দেশনা দেন।
কোতোয়ালী থানার নন্দনকানন এলাকার হরিপদ দত্তের বিধবা স্ত্রী সুমতি দত্ত তিন মেয়েকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বয়স ও অসুস্থতার কারণে চলাফেরা কষ্টকর; ভিক্ষা করেই দিন কাটে। ব্যস্ততার মাঝেও সুমতির দীর্ঘশ্বাস মনোযোগ দিয়ে শোনেন জেলা প্রশাসক। তাৎক্ষণিক সহায়তার পাশাপাশি ভবিষ্যতে স্থায়ী সমাধানের পথ খোঁজার আশ্বাস দেন তিনি।
জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, গণশুনানিতে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষ অনেক সময় হাসিমুখে ফেরেন। জেলা প্রশাসক নিজেও বলেন, তার দরজা সব নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত। সাপ্তাহিক গণশুনানিতে প্রতিটি মানুষকে সাধ্যমতো সেবা দেওয়াই তার দায়িত্ব, আর এমন মানবিক উদ্যোগে তিনি তৃপ্তি পান।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমার দরজা সবার জন্য সব সময় উন্মুক্ত। সাপ্তাহিক গণশুনানিতে চেষ্টা করি প্রতিটি নাগরিককে সাধ্যমতো সেবা দিতে। রাষ্ট্রের একজন কর্মচারী হিসেবে এটি আমার দায়িত্ব। তবে এমন মানবিক কাজে তৃপ্তি পাই।