কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে মানবপাচারকারী চক্রের তৎপরতা আবারও বেড়েছে। উন্নত জীবনের আশায় তরুণ-তরুণীদের সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর প্রলোভন দেখানো হলেও মাঝপথে তাদের জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ।
উখিয়ার ৪ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা কালা পুতুর ছেলে হামিদ উল্লাহ (২০) গত মাসে স্কুলে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয়। পরে জানা যায়, সে সাগরপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। বর্তমানে অজ্ঞাত স্থান থেকে দালালরা তাকে ছাড়িয়ে নিতে ৪ লাখ টাকা দাবি করছে।
কালা পুতু জানান, দারিদ্র্যের মধ্যেও তিনি ছেলেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করিয়েছেন। সংসারের চাপে কাজ করতে বললেও ছেলে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চেয়েছিল। এখন তার কোনো খোঁজ না পেয়ে উদ্বেগে দিন কাটছে পরিবারের।
একই ধরনের ঘটনার শিকার হয়েছেন নূর হাবা ও খায়রুল বশরের পরিবারও। নূর হাবা জানান, বন্ধুর পরিচয়ে তার ছেলেকে বাইরে নিয়ে গিয়ে পাচার করা হয়। পরে অচেনা নম্বর থেকে ফোন করে ছেলের ছবি ও কণ্ঠ শোনানো হয় এবং ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। তবে তার ছেলে কোথায় আছে তা নিশ্চিত নয়।
খায়রুল বশর বলেন, গত ফেব্রুয়ারি থেকে তার ছেলে নিখোঁজ। ধারণা করা হচ্ছে, দালালদের মাধ্যমে তাকে সাগরপথে পাচার করা হয়েছে।
রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, দালালরা সরাসরি ক্যাম্পে সক্রিয় না হয়ে বাইরে ওঁত পেতে থাকে। তরুণদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে মোবাইল ফোনে বিদেশে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলিয়ে প্রলোভন দেখানো হয়। সহজে মালয়েশিয়ায় পৌঁছানো ও ভালো আয়ের আশ্বাস দিয়ে তাদের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় পাঠানো হচ্ছে।
ক্যাম্পবাসী ফরমিনা জানান, অনেক ক্ষেত্রে আগেই তরুণদের ‘বেচাকেনা’ হয়ে যায়। পরে কাজের কথা বলে বাইরে এনে ট্রলারে তুলে দেওয়া হয়।
উখিয়াস্থ ৮ এপিবিএনের অধিনায়ক রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, সাগরপথে বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের প্রলোভন দেখিয়ে আকৃষ্ট করা হচ্ছে। পাশাপাশি উন্নত জীবনের আশায় অনেকে নিজেরাও ঝুঁকি নিয়ে মালয়েশিয়া বা অন্যান্য দেশে পাড়ি দিচ্ছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ থানায় মানবপাচার সংক্রান্ত বহু মামলা রয়েছে, অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং আরও মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এ কারণে কক্সবাজারে মানবপাচার বিষয়ক বিশেষ আদালত স্থাপনের দাবি উঠেছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক বা শরণার্থী মর্যাদা না পেয়ে রোহিঙ্গারা হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় ক্যাম্পে বসবাস করছে। ভবিষ্যৎ ও সন্তানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত থাকায় তারা সহজেই প্রলোভনের শিকার হচ্ছে। এ সুযোগে মানবপাচার চক্র সক্রিয়ভাবে কাজ করছে, যেখানে কিছু ক্ষেত্রে রোহিঙ্গারাই টাকা জোগাড় করে দালালদের মাধ্যমে পাচারের পথে যাচ্ছে।
প্রসঙ্গত, গত পাঁচ মাসে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় কক্সবাজার থেকে ৩৩৫ জনকে উদ্ধার করেছে কোস্টগার্ড। একই সময়ে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত ৩০ জনকে আটক করা হয়েছে।