চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের সাপ্তাহিক গণশুনানি কক্ষটি যেন পরিণত হয়েছিল অসহায় মানুষের শেষ ভরসার ঠিকানায়। বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) জীবনের নানা সংকট, অভাব আর অনিশ্চয়তার গল্প নিয়ে একে একে হাজির হন ভুক্তভোগীরা। সবার কথাই মনোযোগ দিয়ে শোনেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। কারও চোখে ছিল উৎকণ্ঠা, কারও কণ্ঠে দীর্ঘদিনের চাপা কষ্ট—সবার প্রত্যাশা ছিল একটাই, কেউ যেন পাশে দাঁড়ান।
নগরের হালিশহর থানার বড়পোল এলাকার হাফেজ মোহাম্মদ আবুল হোসাইন দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মসজিদে ইমামতি ও রমজানে খতম তারাবির নামাজ পড়িয়ে সংসার চালিয়ে আসছেন। পাশাপাশি একটি হাফেজিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করে দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি।
হঠাৎ করে মাদ্রাসার চাকরি চলে যাওয়ায় ভেঙে পড়ে সেই স্বপ্নের ভিত। সংসারে নেমে আসে চরম আর্থিক সংকট। একমাত্র ছেলের এসএসসি পরীক্ষার ফি ও টেস্ট পেপারের খরচ জোগাড় করাও অসম্ভব হয়ে পড়ে। পরিচিতজনদের পরামর্শে গণশুনানিতে এসে নিজের কষ্টের কথা তুলে ধরলে জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেন। কার্যালয় থেকে বেরিয়ে আবুল হোসাইনের চোখে-মুখে ফুটে ওঠে স্বস্তি ও কৃতজ্ঞতা। তিনি বলেন, স্যার মন দিয়ে কথা শুনেছেন। সঙ্গে সঙ্গে সাহায্য করেছেন। মনে হয়েছে, আমরা একা নই।
লোহাগাড়া থানার উত্তর কলাউজান গ্রামের মো. ইছহাক দুর্ঘটনায় বাম হাত সম্পূর্ণ হারিয়ে কর্মক্ষমতা হারান। এতে তার উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যায়। এর মধ্যেই বৃদ্ধা মা জটিল রোগে আক্রান্ত হলেও অর্থাভাবে চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হচ্ছিল না। শেষ আশ্রয় হিসেবে গণশুনানিতে এসে তিনি আর্থিক সহায়তা পান। ইছহাক বলেন, ডিসি স্যার আমার কষ্ট বুঝেছেন। এখন অন্তত মায়ের চিকিৎসা করাতে পারব।
নগরের কোতোয়ালী থানার আশকারদিঘীরপাড় এলাকার সীমা দে স্বামীহারা। তার ছেলে সিদ্ধার্থ দে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও অর্থাভাবে তা সম্ভব হচ্ছিল না। দুই মেয়ে স্কুলে পড়াশোনা করছে। প্রতিবন্ধী সন্তানের সার্বক্ষণিক দেখাশোনার কারণে নিয়মিত কাজ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। গণশুনানিতে এসে জেলা প্রশাসকের সহায়তা পেয়ে তিনি বলেন, এই সাহায্য আমার সন্তানের চিকিৎসায় নতুন আশা জাগিয়েছে।
রাউজান উপজেলার পবন বড়ুয়া জটিল লিভার সমস্যায় আক্রান্ত। চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে না পেরে পরিবার নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন তিনি। গণশুনানিতে আবেদন জানালে তার প্রতিও মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, সরকারি তহবিল সীমিত। কিন্তু মানুষের অসহায় গল্প শুনলে চুপ করে থাকা যায় না। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। সহায়তা হয়তো চাহিদার তুলনায় কম, তবু সরকার যে তাদের পাশে আছে—সেই বার্তাটিই পৌঁছে দিতে চাই।
।