সারা দেশে যখন জমে উঠেছে নির্বাচনী উত্তাপ, তখন তার ব্যতিক্রম পার্বত্য তিন জেলা— রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে পাহাড়ে নেই চেনা ভোটের উৎসব। শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভাব এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর অনুপস্থিতিতে এখানকার ভোটের মাঠ অনেকটাই নিরুত্তাপ। তবে এই নীরবতার ভেতরেও ভোটারদের একটাই জোরালো প্রত্যাশা— ‘যেই জিতুক, পাহাড়ে যেন ফিরে আসে শান্তি ও সম্প্রীতি’।
ভোটাররা বলছেন, নির্বাচন মানেই সাধারণত উৎসবের আমেজ ও ভোটের লড়াই। কিন্তু রাঙামাটিতে এবার সেই চিত্র চোখে পড়ছে না। পার্বত্য অঞ্চলের প্রভাবশালী কোনো আঞ্চলিক সংগঠন এবারের নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় পাহাড়ি ভোটারদের বড় একটি অংশের কাছে এই নির্বাচন ‘পানসে’ হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পার্বত্য অঞ্চলে সংঘাত-সহিংসতা বেড়েছে। গত দেড় বছরে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে একাধিকবার। ফলে ভোটারদের প্রধান চাওয়া— যেই জিতুক, পাহাড়ে যেন শান্তি ও সম্প্রীতি ফেরে। এই বিষয়টি প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণাতেও গুরুত্ব পাচ্ছে।
শান্তি ও সম্প্রীতিই পাহাড়ের মূল দাবি
তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোটার রাঙামাটিতে। এখানকার প্রায় অর্ধেক ভোটার বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর। রাঙামাটি কলেজ মোড় এলাকার তরুণ নাফিজ হোসেন বলেন, ‘এখানে ভোটারদের সবচেয়ে বড় চাহিদা শান্তি ও জাতিগত সম্প্রীতি। ছোটখাটো ইস্যু থেকেই প্রায়ই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।’
অসম বস্তি বাজার এলাকার সুমিত মারমা বলেন, ‘সহিংসতার কারণে পর্যটন খাতে বড় ক্ষতি হয়। সংঘাত হলে পর্যটক আসে না, ব্যবসায়ীরা বিপদে পড়েন।’ একই এলকার বৃদ্ধ মোহাম্মদ সিরাজুদ্দৌলা বলেন, ‘বেকারত্ব বাড়ছে, দ্রব্যমূল্য বাড়ছে। কিন্তু কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ে না।’
খাগড়াছড়ির কমলছড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা প্লানোচিং মারমা বলেন, ‘জেলার প্রধান সমস্যা সাম্প্রদায়িকতা। আমরা এমন একজন সংসদ সদস্য চাই, যিনি অসাম্প্রদায়িক হবেন এবং সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াবেন।’
ভোটারদের মতে, পাহাড়ি-বাঙালি সম্প্রীতি বজায় থাকলে অর্থনৈতিক সংকট ও বেকারত্ব অনেকটাই কমানো সম্ভব।
নির্বাচনী ফ্যাক্টর আঞ্চলিক সংগঠন
রাঙামাটিতে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর প্রভাব বরাবরই বড় ফ্যাক্টর। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) পাহাড়ি ভোটারদের মধ্যে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে জেএসএস প্রার্থী ঊষাতন তালুকদার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে চমক দেখান। তবে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে সংগঠনটির সমর্থকরা অংশ না নেওয়ায় ভোটার উপস্থিতি ছিল খুবই কম।
স্থানীয় এক গণমাধ্যমকর্মী বলেন, ‘আঞ্চলিক সংগঠনগুলো সিদ্ধান্ত নিলে একসাথেই নেয়। তারা ভোট বর্জন করলে কেন্দ্র ফাঁকাই থাকে।’ এবারও জেএসএস নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্তাপ অনেকটাই কমে গেছে।
সুবিধায় বিএনপি, জামায়াত জোটে অসন্তোষ
রাঙামাটিতে বিএনপির প্রার্থী আইনজীবী দীপেন দেওয়ান আঞ্চলিক দলের অনুপস্থিতিতে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন বলে মনে করছেন ভোটারদের একাংশ। তিনি বলেন, ‘ভোটারদের ভালো সাড়া পাচ্ছি। নির্বাচিত হলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষাই হবে আমার প্রথম অগ্রাধিকার।’
অন্যদিকে, দীর্ঘদিন প্রচারণা চালানো জামায়াত প্রার্থী মোখতার আহমেদ শেষ পর্যন্ত জোট সমঝোতায় প্রার্থী হতে পারেননি। আসনটি ছাড় দেওয়া হয়েছে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী আবু বকর সিদ্দিককে। ভোটারদের মতে, তার পরিচিতি তুলনামূলক কম। তিনি বলেন, ‘আমরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছি। জোটের সবাই আমাদের সঙ্গে আছে।’
খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক অনিমেষ চাকমা রিংকু বলেন, ‘জেলায় দলের শক্ত অবস্থান রয়েছে। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি সক্রিয় রয়েছে।’