,

 

ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটি, দৈনিক কমেছে ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ : 23 July 2026, 11:26

কক্সবাজারের মহেশখালীতে স্থাপিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এর প্রভাবে শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন এবং আবাসিক গ্রাহকরা গ্যাস সংকটে পড়েছেন। অনেক এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সিএনজি স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪১০ কোটি ঘনফুট হলেও স্বাভাবিক সময়েও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয় ২৭০ থেকে ২৮০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যেই নতুন করে ৪৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ কমে যাওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

মহেশখালীতে বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে, যেখান থেকে সাধারণ সময়ে দৈনিক ৯০ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। তবে পেট্রোবাংলার মালিকানাধীন একটি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। অপর টার্মিনালটি সামিটের হলেও দুটি টার্মিনালই পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জি।

গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। অনেক পরিবার সকালে ও রাতে রান্না করতে পারছেন না। হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেকারি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যায় পড়েছে। শিল্পাঞ্চলের গ্যাসনির্ভর অনেক কারখানা প্রয়োজনীয় চাপ না পাওয়ায় উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে, যা রপ্তানিমুখী শিল্পেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। অনেক স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় চালকদের এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে ঘুরতে হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও অনেকেই গ্যাস সংগ্রহ করতে পারছেন না। এতে গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনেও বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি হলেও দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে। ফলে আমদানি অবকাঠামোর কোনো একটি অংশে সমস্যা দেখা দিলেই জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে।

সংকট মোকাবিলায় সরকার দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়াতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে পর্যায়ক্রমে ১০০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে ৭২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি নতুন কূপ খনন প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। পাশাপাশি চতুর্থ ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনার উদ্যোগ এবং জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণের কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব (অপারেশন) মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, “এফএসআরইউটির কারিগরি সমস্যা দ্রুত সমাধানে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও কারিগরি বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। সীমিত সরবরাহের মধ্যেও জরুরি ও অগ্রাধিকার খাতে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখার চেষ্টা চলছে। সমস্যা সমাধান হলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছি।”

তিনি জানান, দেশে প্রতিদিন প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি রয়েছে।

জ্বালানি তেলের সংকট নিয়ে ছড়ানো গুজব উড়িয়ে দিয়ে মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, দেশে বর্তমানে ডিজেলের মজুদ রয়েছে প্রায় ৩১ দিনের, অকটেন ৩৬ দিনের, পেট্রোল ২০ দিনের, ফার্নেস অয়েল ২৫ দিনের এবং জেট ফুয়েল ২০ দিনের। আগামী জুলাই-আগস্ট পর্যন্ত জ্বালানি তেল সরবরাহে কোনো সংকটের আশঙ্কা নেই।

তিনি আরও জানান, ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে আরও ১ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল দেশে পৌঁছাবে এবং আগস্ট মাসে আসবে আরও ২ লাখ ৪০ হাজার টন। পাশাপাশি অপরিশোধিত তেল আমদানার প্রচলিত পথে কোনো সমস্যা দেখা দিলে বিকল্প রুট ব্যবহারের প্রস্তুতিও সরকারের রয়েছে।

চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ কমেছে ২৮ মিলিয়ন ঘনফুট

চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক (বিতরণ) মো. রফিক খান জানান, এতদিন প্রতিষ্ঠানটি দৈনিক ২৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেত। বুধবার থেকে সরবরাহ ২৮ মিলিয়ন ঘনফুট কমে যাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ হ্রাস পেয়েছে।

তিনি বলেন, সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে শিল্প, বাণিজ্যিক ও আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাস ব্যবহারে প্রভাব পড়তে পারে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।

গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামের ইস্পাত কারখানাসহ গ্যাসনির্ভর বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কায় রয়েছে।

মোস্তফা হাকিম গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ সরোয়ার আলম বলেন, তাদের এইচএম স্টিল ও গোল্ডেন ইস্পাত কারখানায় আগের তুলনায় গ্যাসের চাপ কম পাওয়া যাচ্ছে। এতে উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। তবে এখনো বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়নি। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ইস্পাত শিল্পে এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে।

তিনি আরও বলেন, গ্যাসের চাপ কমে গেলে চুল্লিকে প্রয়োজনীয় তাপমাত্রায় নিতে বেশি সময় লাগে। ফলে নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন সম্ভব হয় না। অথচ গ্যাসের ব্যবহার ও বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হয় না।

ভিডিও