দেশের ব্যবসা বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম ধীরে ধীরে অনিরাপদ জনপদে পরিণত হচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, একের পর এক হত্যা, ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবি, বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ, অপহরণ বাণিজ্য, গুলি করা, হামলা-ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটছে নিয়মিত বিরতিতে। কখনও দলবেঁধে কাউকে গুলি করে মারা হচ্ছে আবার কখনও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনায় গিয়ে চলছে হুমকি দমকি। আর এসব কিছুর পেছনে বার বার নাম আসছে বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের। দীর্ঘ সময় ধরে সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া এমন কর্মকাণ্ড চলতে থাকলেও তাদের লাগাম টানতে পারছে না পুলিশ। এতে আতঙ্কে দিন কাটছে চট্টগ্রাম নগর ও বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দাদের।
জানা গেছে, পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান বিদেশে বসে চট্টগ্রামে খুন, চাঁদাবাজির নির্দেশনা দিয়ে আসছেন। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনায় গড়ে তুলেছেন অর্ধশতাধিক সক্রিয় সদস্যের বাহিনী। বাহিনীর সদস্যরা অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। প্রযুক্তির ব্যবহারেও এগিয়ে থাকা, পাহাড়ি এলাকায় আস্তানা তৈরির কারণে বড় সাজ্জাদের সহযোগীদের ধরা কঠিন হয়ে উঠেছে বলে দাবি পুলিশের।
পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, দিনদুপুরে অতর্কিতে এসে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার পর পাহাড়ের নিরাপদ আস্তানায় গা ঢাকা দেন সন্ত্রাসী বাহিনীটির সদস্যরা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাজ্জাদ বাহিনী বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এ সময় চট্টগ্রামে জোড়া খুনসহ ১৪টি হত্যাকাণ্ডে সাজ্জাদ বাহিনীর অনুসারীদের নাম উঠে এসেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি, ব্যবসায়ীদের হুমকির ঘটনা রয়েছে অনেক।
বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের বাহিনীর বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে একের পর এক আলোচিত হত্যাকাণ্ড ও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। গত বছরের ৩০ মার্চ বাকলিয়ায় জোড়া খুন, ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে ঢাকাইয়া আকবর হত্যা, ৫ নভেম্বর বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহর জনসংযোগে হামলায় সরোয়ার হোসেন বাবলার নিহত হওয়া এবং চলতি বছরের ১৩ জুন রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা এবং গত ৮ মে রাত দশটার দিকে নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার রৌফাবাদের বাঁশবাড়িয়া বিহারি কলোনিতে রাজু নামের এক যুবককে প্রকাশ্যে গুলির সাজ্জাদ বাহিনীর সদস্যদের নাম উঠে আসে। এ ছাড়া চাঁদা না পেয়ে নগরের চন্দনপুরায় এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে দুই দফা গুলি চালানোর অভিযোগও রয়েছে সাজ্জাদ বাহিনীর বিরুদ্ধে। পুলিশের দাবি, এসব ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

সর্বশেষ গতকাল সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নগরের চকবাজার থানার চন্দনপুরা-বাকলিয়া এক্সেস সড়কে অবস্থিত ডিজিটাল ডট নেট (ডিডিএন) কার্যালয়ে দুই কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালায় সন্ত্রাসীরা। পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের অনুসারীরা এ হামলায় জড়িত। তাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
প্রতিষ্ঠানের মালিক আদিল বিন মামুন বলেন, দুই দিন আগে বিদেশি একটি নম্বর থেকে ফোন করে ডেভিড ইমন (মোবারক হোসেন ইমন) পরিচয়ে একজন তার সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় ইমন বলেন, ‘ব্যবসা করতে হলে এককালীন ২ কোটি টাকা দিবি। মাসে দিবি ১০ লাখ। এখন থেকে ব্যবসা আমরা করব।’ আদিল বিন মামুন অভিযোগ করেন, চাঁদা না দেওয়ায় সন্ত্রাসীরা তাঁর প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়েছে।
ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সশস্ত্র দল হঠাৎ ডিডিএনের কার্যালয়ে ঢুকে পড়ে। দেশীয় অস্ত্রধারী ওই ব্যক্তিরা অফিসের কম্পিউটার, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মুঠোফোন এবং বিভিন্ন আসবাব ভাঙচুর করেন। একজনকে কুড়াল দিয়ে কম্পিউটার ও অন্যান্য সরঞ্জামে আঘাত করতে দেখা যায়। এ সময় তারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখান। ঘটনার পর থেকে ওই এলাকার ইন্টারনেট ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
বড় সাজ্জাদের সাথে আর কে?

ফাইল ছবি
চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার বাসিন্দা সাজ্জাদ আলী খান ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’ নব্বইয়ের দশক থেকে অপরাধ জগতে আলোচিত। পুলিশের তথ্যমতে, খুনসহ একাধিক মামলার আসামি তিনি। ২০০০ সালের বহদ্দারহাটের আলোচিত ‘এইট মার্ডার’ মামলায় তার নাম উঠে আসে। একই বছরের ১ অক্টোবর একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হলেও ২০০৪ সালে জামিনে মুক্তি পেয়ে বিদেশে পালিয়ে যান। এরপর থেকেই বিদেশে অবস্থান করে প্রযুক্তির মাধ্যমে বাহিনী পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তাকে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ এখনও বহাল রয়েছে।

শুরুর দিকের সহযোগীদের মধ্যে ছিলেন নুরনবী ম্যাক্সন, সরোয়ার হোসেন বাবলা ও ঢাকাইয়া আকবর। পরে ২০১৫ সাল থেকে দেশে বাহিনীর নেতৃত্ব দেন ছোট সাজ্জাদ। গত বছর ছোট সাজ্জাদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর বর্তমানে মোহাম্মদ রায়হান ও মোবারক হোসেন ইমনসহ কয়েকজন সহযোগী বাহিনীর কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে পুলিশের দাবি। তাদের বিরুদ্ধে খুন, চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলা রয়েছে।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মুঠোফোনে সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী গণমাধ্যমকে বলেন, আমি চাঁদাবাজি, খুনে জড়িত নই। উল্টো সন্ত্রাসীরা আমার বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল। তার বিচার এখনো পাইনি।
জানতে চাইলে নগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী গতকাল রাতে বলেন, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। ইতিমধ্যে পুলিশ অস্ত্রসহ সাজ্জাদ বাহিনীর কিছু সদস্যকে ধরেছে। বাকি ব্যক্তিদের ধরতেও পুলিশ কাজ করছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সাবেক সভাপতি মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ রাখতে থানা-পুলিশের পাশাপাশি পুলিশের বিশেষ শাখারও সন্ত্রাসীদের নজরদারিতে রাখা উচিত। এ জন্য পুলিশের সোর্সকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। সন্ত্রাসীদের পেছনে কোনো রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।