চট্টগ্রামে প্রতিবছরের মতো এবারও জুন মাস থেকেই ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে ৩৭ জনের দেহে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। চলতি জুন মাসেও নতুন কয়েকজন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তবে এখনো পরিস্থিতি বড় আকার ধারণ না করায় জনমনে ডেঙ্গু নিয়ে তেমন আলোচনায় আসেনি বিষয়টি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ঝুঁকি কমেনি। বরং এখনই কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
জানা গেছে, মশা মারা শিখতে চট্টগ্রামের মেয়রসহ একটি দল সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা ছিলো। তবে প্রধানমন্ত্রীর এক ‘নোট’ সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে শুরু হয় নানামুখী আলোচনা সমালোচনা। থেমে যায় মশা নিধন শেখার বিদেশ সফর।
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ও নগরবাসী বিষয়টি নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও ডোবা কিংবা নালায় মশারা ব্যস্ত বংশবিস্তারে। যার চিত্র চোখে পড়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকায়। সরজমিনে নগরীর চকবাজার কাঁচাবাজারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া চাক্তাই খালে দেখা গেছে স্থির পানি ও আবর্জনায় ভরাট হয়ে মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বাজারের বর্জ্য সরাসরি খালে ফেলা এবং ডাবের খোসায় জমে থাকা পানি ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার বিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।
চকবাজার এলাকা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে রসুলবাগ আবাসিক এলাকার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে চাক্তাই ডাইভারশন খাল। জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় খালের দুই পাশে দেয়াল নির্মাণ ও বাঁধ দেওয়া হয়েছে। তবে এই বাঁধের কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে বদ্ধ পানির সৃষ্টি হয়েছে, যা মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
নগরবাসী বলছেন, এসব এলাকা ছাড়াও সন্ধ্যা হলেই ডোবা, নালা কিংবা ডাস্টবিন থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে মশা ছড়িয়ে পড়ে বাসা বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানে। যা শিশু বৃদ্ধ থেকে সকল বয়সী মানুষকে ফেলছে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে।
জেলা সিভিল সার্জনের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১৭৬ জন এবং একজনের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষ করে এপ্রিল ও মে মাসে রোগীর সংখ্যা বাড়ার প্রবণতা দেখা গেছে। জুন মাসে এখনও পর্যন্ত ৩ জনের শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে চট্টগ্রামে ৪-৫ হাজার ডেঙ্গু রোগী শনাক্তের চিত্র দেখা গেছে। এছাড়া মৃতের সংখ্যাও অর্ধশত বা শত পেরিয়ে যায়।
তবে চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গুতে আক্রোন্ত হয় জুন থেকে বছরের শেষের মাসগুলোতে। গত বছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন ৪ হাজার ৮৬৪ জন এবং মৃত্যূ হয় ২৭ জনের। যারমধ্যে মে পর্যন্ত প্রথম ৫ মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিলো ২৬৯ জন। জুন থেকে বাড়তে থাকে রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা। একই চিত্র ছিলো ২০২৪ সালেও। বছরজুড়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন মোট ৪ হাজার ৩২৩ রোগী এবং মৃত্যু হয় ৪৫ জনের। ২০২৪ সালে আক্রান্তদের মধ্যে প্রথম ছয় মাসে রোগী ছিলো কেবল ১৯৮ জন। সে বছর জুলাই থেকে বাড়তে থাকে ডেঙ্গু রোগী।
তবে এবার হমের প্রকোপ থাকায় ডেঙ্গুর চাপ বাড়লে রোগী নিয়ে হাসপাতালগুলো হিমশিম খেতে পারে এমটাই আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে আগাম প্রস্তুতির পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, চট্টগ্রাম শহরে মশার বংশবিস্তার হয় দ্রুত। শহর থেকে মশার লার্ভা সংগ্রহ করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এনে দেখি সেগুলো উড়ছে। লার্ভা ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ মশায় পরিণত হয়। তাই সিটি কর্পোরেশনের উচিত পূর্ণাঙ্গ মশার পাশাপাশি লার্ভা ধ্বংসে মনোযোগী হওয়া।
নগরীর মশা নিধনের চসিক সচেষ্ট রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি ছিটানো হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তির কীটনাশক। জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী বলেন, মশক নিধনে খালনালা পরিষ্কার করা হয়েছে। বির্জা খালের বাঁধ শিগগিরই অপসারণ করা হবে। আধুনিক প্রযুক্তির কীটনাশক বিটিআই ছিটানো হচ্ছে। এই ওষুধের কারণে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমেছে। দেশি প্রযুক্তির ভেষজ ওষুধ প্রয়োগেরও চিন্তা আছে।
এদিকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে শনিবার চট্টগ্রামে সচেতনতামূলক র্যালির আয়োজন করেছে জেলা প্রশাসন ও সিভিল সার্জন কার্যালয়। র্যালিতে অংশ নেন বিভাগীয় কমিশনার, বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য), জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন এবং ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা। তারা বলেন, ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।