বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

বিদেশ সফরে আমন্ত্রণকারীদের থেকে সাড়ে ৩ কোটি টাকার ওষুধ কিনেছিলো চসিক

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ : ৩ জুন ২০২৬, ০৭:৪৪

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মশকনিধন কার্যক্রমে ওষুধ ক্রয় ও বিদেশ সফর প্রস্তাব ঘিরে ‘স্বার্থের সংঘাত’ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জানা গেছে, যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে মেয়রসহ কর্মকর্তাদের সফরের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সেই প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত ওষুধ আগেই সাড়ে ৩ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে কিনেছিল চসিক।

সিটি কর্পোরেশন সূত্র জানায়, ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেস এলএলসির আমন্ত্রণে মেয়র শাহাদাত হোসেনসহ পাঁচ কর্মকর্তার যুক্তরাষ্ট্র সফরের প্রস্তাব করা হয়। সফরের অর্থায়নের কথা ছিল প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে। তবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সফরটির অনুমোদন দেয়নি।

গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ফরাস পেস্ট কন্ট্রোলের মাধ্যমে প্রায় ৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকায় বিটিআই লার্ভিসাইড কেনে চসিক। যা ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেস এলএলসির পণ্য। প্রতিষ্ঠানটির ওষুধ এখানে বিক্রি করে থাকে প্রিমো হেলথ লিমিটেড। আবার প্রিমো হেলথের প্রতিনিধি হিসেবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে ওষুধ সরবরাহ করে ফরাস পেস্ট কন্ট্রোল। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ফরাস পেস্ট কন্ট্রোলকে বিটিআই সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এই কার্যাদেশের আওতায় ২ হাজার ২০০ ইউনিট ওষুধ কেনে সিটি কর্পোরেশন।

সিটি কর্পোরেশন সূত্র জানায়, আগামী ৯ জুন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা ছিল মেয়র ও কর্মকর্তাদের। প্রতিনিধিদলের দেশে ফেরার কথা ছিল ১৬ জুন। এ সফরে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো ও ফ্লোরিডা রাজ্যে ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেস এলএলসির ল্যাব ও কারখানা পরিদর্শন কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত ছিল। চট্টগ্রামে এই ধরনের ল্যাব স্থাপনেও আলোচনা করার প্রস্তুতি ছিল প্রতিনিধিদলের। এ ছাড়া শিকাগো সিটি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের একটি ‘সিস্টার সিটি’ স্মারক সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

তবে মেয়রসহ কর্মকর্তাদের এই সফরের অনুমোদন দেননি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মশা নিধন শেখা বা দেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় যাওয়ার দরকার নেই, দেশেই সন্ধ্যার পর কোনো ডোবার পাশে অবস্থান করলে মশা নিধনের উদ্ভাবনী পদ্ধতি বের করা সম্ভব বলে অভিমত দেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মশকনিধন কার্যক্রম, বিদেশ সফরের প্রস্তাব এবং ওষুধ কেনাকাটা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষজ্ঞ কীটতত্ত্ববিদদের মতে, এই ধরনের সফরের মেয়রসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। এ ছাড়া যে কোম্পানির আমন্ত্রণে বিদেশ সফর, সে কোম্পানির ওষুধ কেনা হয়েছে আট মাস আগে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি আখতার কবির চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, ঠিকাদার বা সরবরাহকারীদের কাছ থেকে এক কাপ লাল চা খাওয়ারও সুযোগ নেই। কিন্তু সেখানে রীতিমতো বিদেশভ্রমণের আয়োজন করা হয়েছে। এগুলো একধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি। প্রধানমন্ত্রী এবার থামিয়েছেন। ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের সফর চিরতরে বন্ধ হয়, তার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন না পাওয়ার বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেননি সিটি কর্পোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন। তবে গত মঙ্গলবার মেয়র বিবৃতিতে বলেন, মশক নিয়ন্ত্রণ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে আধুনিক ও কার্যকর প্রযুক্তি সম্পর্কে জানার আগ্রহ থেকেই বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারের পক্ষ থেকে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, আমি তা সম্পূর্ণ শ্রদ্ধার সঙ্গে এবং সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিয়েছি।

ওষুধ কেনা ও ব্যবহার শুরুর আট মাস পরে কেন বিদেশ সফর—এই ব্যাপারে জানতে চাইলে সিটি করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কেউ প্রকাশ্য মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিটিআই ওষুধ ব্যবহারের পর সুফল পাওয়া যাচ্ছিল। আগামী দিনে আরও বড় পরিসরে তা ব্যবহারের চিন্তাভাবনা ছিল। এ জন্য এই সফরের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল।

ভিডিও