যে বয়সে শিশুদের কাঁধে থাকার কথা স্কুলব্যাগ, হাতে থাকার কথা বই, খাতা, কলম— সেই বয়সেই পটিয়া উপজেলার বিভিন্ন গ্যারেজ, ওয়ার্কশপ ও বাজারে দেখা যাচ্ছে তাদের ঘামঝরা শ্রম। কারও হাতে গ্রাইন্ডিং মেশিন, কেউ তেল-কালিতে ভেজা যন্ত্রাংশ পরিষ্কার করছে, কেউ বা ভারী টায়ার টেনে নিয়ে যাচ্ছে। পাঠশালার বেঞ্চ ছেড়ে জীবিকার লড়াইয়ে নেমে পড়া এই শিশুদের চোখে নেই শৈশবের স্বপ্ন, আছে টিকে থাকার তাগিদ।
সাম্প্রতিক সময়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, লোহার কারখানায় ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্র চালাচ্ছে অল্পবয়সী কিশোররা। সড়কের পাশে গাড়ি মেরামতের দোকানে কাজ করছে কেউ কেউ। তীব্র শব্দ, উড়ন্ত ধাতব কণা আর ভারী যন্ত্রপাতির ভিড়ে তাদের নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই দীর্ঘ সময় কাজ করছে তারা। সামান্য ভুলেই ঘটতে পারে বড় দুর্ঘটনা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দারিদ্র্যই এই শিশু শ্রমের প্রধান চালিকা শক্তি। অধিকাংশ শিশুই নিম্নআয়ের পরিবারের সদস্য। সংসারের অভাব মেটাতে স্কুল ছেড়ে কাজে নামতে বাধ্য হচ্ছে তারা। এক অভিভাবক আক্ষেপ করে বলেন, ‘পেটের দায়ে ছেলেকে কাজে দিতে হয়েছে। লেখাপড়া করানোর সামর্থ্য নেই।’

অন্যদিকে এক ওয়ার্কশপ মালিকের দাবি, ‘ওরা নিজেরাই কাজ শিখতে আসে, আমরা শুধু সুযোগ দিই।’ তবে বাস্তবতা হলো— কম মজুরিতে সহজে কাজ পাওয়া যায় বলেই অনেক মালিক শিশুদের কাজে নিতে আগ্রহী।
শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, এটি শুধু মানবিক সংকট নয়; এটি আইনেরও স্পষ্ট লঙ্ঘন। বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশু নিয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু মাঠপর্যায়ে তদারকির ঘাটতি ও আইনের দুর্বল প্রয়োগের কারণে এই প্রবণতা কমছে না। বরং নীরবে-নিভৃতে বাড়ছে।
সচেতন মহল মনে করছে, শুধু অভিযানে নয়; দরকার সমন্বিত উদ্যোগ। দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার করা, ঝরে পড়া শিশুদের স্কুলে ফেরাতে বিশেষ প্রণোদনা চালু করা এবং নিয়মিত প্রশাসনিক নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আজকের এই অবহেলা ভবিষ্যতের জন্য বড় মূল্য ডেকে আনতে পারে। কারণ প্রতিটি শিশুই সম্ভাবনার আলো। সেই আলো যদি কারখানার ধোঁয়া ও গ্যারেজের তেল-কালিতে ঢেকে যায়, তবে অন্ধকারে ঢেকে যাবে একটি প্রজন্মের স্বপ্নও। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে স্কুলের বেঞ্চ ফাঁকা হবে, আর ভরে উঠবে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মস্থল— যেখানে শৈশব হারিয়ে যায় নীরবে।