রাঙামাটিতে ভয়াবহ পাহাড়ধসের নয় বছর পূর্ণ হলেও ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস বন্ধ হয়নি। ২০১৭ সালের ১৩ জুনের সেই মর্মান্তিক ঘটনায় রাঙামাটিতে ১২০ জন এবং বৃহত্তর চট্টগ্রামে মোট ১৫৮ জন প্রাণ হারান। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো বহু পরিবার পাহাড়ধসের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। ফলে বর্ষা এলেই ফিরে আসে আতঙ্ক।
পাহাড়ধসে দুই সন্তান হারানো রাঙামাটি শহরের ভেদভেদী এলাকার বাসিন্দা বাদল দত্ত বলেন, ছেলেদের লাশ দুটো যখন কাঁধে নিলাম, মনে হলো পাহাড়টাই আমার কাঁধে উঠে গেছে। তিনি বলেন, টানা বৃষ্টি হচ্ছিল। এর মধ্যে রাতের খাবার খেয়ে আমরা ঘুমিয়ে পড়ি। পরদিন ভোরে হঠাৎ এক ভয়ানক শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। দেখি পাশের পাহাড়টা এসে পড়েছে আমার ঘরের ওপর। এখনো সে দৃশ্য ভুলতে পারিনি।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ১৩ জুন রাঙামাটিতে ১৪২ স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় ছয় হাজার ঘরবাড়ি, ৮৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শত শত একর কৃষিজমি। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ২০০ কোটি টাকা।
পাহাড়ধসের পরও রাঙামাটির বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি গড়ে উঠছে। জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার তথ্য বলছে, রাঙামাটি পৌরসভায় ঝুঁকিপূর্ণ ঢাল রয়েছে ২৯টি। চম্পানির মার টিলা, পশ্চিম মুসলিম পাড়া, চেংগির মুখ, আবদুল আলী একাডেমি–সংলগ্ন ঢাল, এসপি অফিস–সংলগ্ন ঢাল, মাতৃমঙ্গল এলাকা, কাঁঠালতলী মসজিদ কলোনি ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস–সংলগ্ন ঢাল উল্লেখযোগ্য। এসব পাহাড়ে কী পরিমাণ মানুষ বসবাস করে, তার তথ্য জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি।
দুর্যোগ মোকাবিলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি অফিস মিলিয়ে আশ্রয়কেন্দ্র আছে ২৩টি। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসের শঙ্কা তৈরি হলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাসিন্দাদের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হয়। তবে অধিকাংশ লোক নিরাপদ স্থানে যায় না।
পাহাড়ধসে স্ত্রীকে হারানো ভেদভেদী পশ্চিম মুসলিম পাড়ার বাসিন্দা বাসিন্দা আবদুল কুদ্দুস বলেন, বর্ষার সময় টানা বৃষ্টি হলেই কখন আবার পাহাড়ধস হয়, সেই আতঙ্ক কাজ করে। তারপরও ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যাই না। নিজের ঘরের মতো শান্তি সেখানে পাই না। আবার আশ্রয়কেন্দ্রে গেলে ঘরের জিনিসপত্র চুরি হয়ে যাওয়ার ভয়ও থাকে।
পশ্চিম মুসলিম পাড়ার বাসিন্দা নুরুন্নাহার বেগম বলেন, ঘর-সংসার ফেলে কোথায় যাব? তাই ঝুঁকি জেনেও ঘরে থেকে যাই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিবৃষ্টি পাহাড়ধসের তাৎক্ষণিক কারণ হলেও অপরিকল্পিত বসতি, পাহাড় কাটা, বন উজাড়, সড়ক নির্মাণ এবং জনসংখ্যার চাপ এই দুর্যোগকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং কার্যকর পাহাড় ব্যবস্থাপনা ছাড়া ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাণহানি রোধ করা কঠিন হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক ড. মো. ইকবাল সরোয়ার বলেন, এত বড় একটি দুর্যোগ হওয়ার পরও পাহাড় কাটা বন্ধ হয়নি। এখনো অবৈধভাবে পাহাড়ে ও পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে, যা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, পাহাড়ধস প্রতিরোধে পাহাড় কাটা ও বন উজাড় বন্ধ করতে হবে। পাহাড়ে সবুজের আচ্ছাদন বৃদ্ধি করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে সেখানে স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি পাহাড়ধসকে জাতীয় দুর্যোগ নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, এরইমধ্যে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে একটা কমিটি হয়েছিল এবং সেখানে বেশ কিছু সুপারিশ আকারে আমাদের কাছে প্রস্তাবনা দিয়েছিল এবং সে কার্যক্রমগুলো গ্রহণ করার জন্য বলা হয়েছিল। প্রতিবছর বিশেষ করে এই সময়টি জুন, জুলাই, অগাস্ট—এই সময়টা এগুলো নিয়ে কাজ করা হয়ে থাকে।