শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

জঙ্গল সলিমপুর ছাড়লেও নিয়ন্ত্রণ ছাড়েনি ওরা

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ : ১ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৫০

আইনশৃঙ্খলা প্রশাসনের অভিযানের মুখে জঙ্গল সলিমপুর ছেড়ে গেলেও সন্ত্রাসীরা নিয়ন্ত্রণ ছাড়েনি। অপরাধীরা বাইরে থেকে জঙ্গল সলিমপুরের প্লট বাণিজ্য, বিদ্যুৎ ব্যবসাসহ নানা কিছু তদারক করছে বলে অভিযোগ করেছে স্থানীয় একটি সংগঠন। এতে এলাকার দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা প্রশাসনের মদদ রয়েছে বলেও তাদের ভাষ্য। এমন অবস্থায় দীর্ঘদিন পর শান্তি ও স্বস্তি ফিরে পাওয়া জঙ্গল সলিমপুরের স্থানীয় সমাজ রীতিমত শঙ্কিত।

এ ব্যাপারে র‍্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেন, সম্প্রতি কিছু ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।এ ধরনের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে। যেকোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপ সম্পর্কে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানতে হবে।

তিনি আরও বলেন, জঙ্গল সলিমপুর ও আলিপুর এলাকায় নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এখানে একটি স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপনের ব্যাপারে পরিকল্পনা চলছে। জেলা প্রশাসক মহোদয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিদর্শনও করেছেন। আশা করছি দ্রুত সময়ে এটি বাস্তবায়িত হবে।

সরকারি নিয়ন্ত্রণের মাঝেও ইয়াছিন বাহিনী অদৃশ্যে থেকে জঙ্গল সলিমপুর নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ তুলেছে চট্টগ্রাম মহানগর বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ।

১৫ মার্চ জঙ্গল সলিমপুরে ছিন্নমূলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমন অভিযোগ করেছে সংগঠনটি।

সংগঠনের সভাপতি মো. ছায়েদুল হক ছাদু এবং সাংগঠনিক সম্পাদক মীর শাহজাহান বাদশা বলেন, এলাকাটি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আসার পরও ছিন্নমূলের বৈদ্যুতিক মিটারের যাবতীয় দায়িত্ব রহস্যজনকভাবে ওই সন্ত্রাসী ইয়াছিনের লোকজনের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরের অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ এখনো সন্ত্রাসী ইয়াছিন চক্রের হাতেই রয়ে গেছে।

অভিযোগ উঠেছে, ইয়াছিনসহ তার বাহিনীর সদস্যরা ফোনে এবং নানাভাবে সাধারণ মানুষকে হুমকি দিচ্ছে। বিশেষ করে ছিন্নমূলে এসে বিভিন্নজনের গরু ও ছাগল চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। এলাকায় যে বিদ্যুৎব্যবস্থা রয়েছে, তা ফের তারা নিয়ন্ত্রণ করছে।

স্থানীয় ও গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অভিযানের মুখে পড়ে ইয়াছিনসহ তার বাহিনীর সদস্যরা জঙ্গল সলিমপুরের দুর্গম এলাকায় অবস্থান নিয়েছে। নবীনগর ও চাকমা পাড়ায় তারা বর্তমানে অবস্থান নিয়েছে। ভীত সন্ত্রস্ত স্থানীয়রা তাদের ভয়ে রীতিমত শঙ্কিত। দুর্গম এলাকা হওয়ায় এখানে এখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযানে যায়নি। এই সুযোগে সন্ত্রাসীরা সেখান থেকে জঙ্গল সলিমপুর নিয়ন্ত্রণ করছে।

জানা যায়, জঙ্গল সলিমপুরের পুরোনো দখলদার আ্লীনগর সমবায় সমিতির নেতা মো ইয়াসিন। তার নেতৃত্বে এখানে সরকারি পাহাড় দখল করে প্লট নির্মাণ ও বিক্রি, বিদ্যুৎ,পানি ও দোকান ভাড়া বাণিজ্য পরিচালিত হত। পুরো বিষয়টি দেখভাল করত ইয়াসিনের মদদপুষ্ট বাহিনী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ছিন্নমূলের নিয়ন্ত্রণ নেন রিদুয়ান বাহিনী। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক ও সলিমপুর ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. রোকন উদ্দিন মেম্বারের অনুসারী। গত আট/নয় মাস আাগে রিদুয়ান বাহিনীকে হটিয়ে ফের ছিন্নমূলের নিয়ন্ত্রণ নেন ইয়াসিন বাহিনী। জঙ্গল সলিমপুরে র‍্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া হত্যা মামলার প্রধান আসামিও এই বাহিনীর প্রধান ইয়াছিন।

জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসীমুক্ত করতে ২০২১-২২ সালে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালানো হয়। ২০২২ সালে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে বিপুল সংখ্যক অবৈধ স্থাপনা অপসারণ ও পাহাড়ি জমি উদ্ধার করে জেলা প্রশাসন। সেসময় সেখানে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের একটি রোডম্যাপও প্রণয়ন করে সরকার। তবে পরবর্তী সময়ে সরকারের উদ্ধারকৃত জায়গা পুনরায় অবৈধ দখল করে নেয় সন্ত্রাসীরা। চলতি বছর ১৯ জানুয়ারি অভিযানে গেলে সন্ত্রাসীদের হামলায় র‍্যাবের ডিএডি মোতালেব হোসেন নিহত হন। এরপর নড়ে বসে প্রশাসন। গত ৯ মার্চ র‍্যাব, পুলিশ, আনসার, বিজিবি, সেনাবাহিনী ও ম্যাজিস্ট্রেটসহ প্রায় চার হাজার সদস্যের সমন্বয়ে একটি বৃহৎ যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে জঙ্গল সলিমপুর আবার সরকারের নিয়ন্ত্রণে ফেরে। বর্তমানে সেখানে দুটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।

ভিডিও