বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বে সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে দেশ আজ মঙ্গলবার আবার গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ফিরছে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে আজ বিকেলে নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের দায়িত্ব পালনের অবসান হচ্ছে।
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা বিএনপি এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করছে। তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবারের তৃতীয় একজন ক্ষমতায় আসছেন। তাঁর বাবা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ছিলেন দেশের রাষ্ট্রপতি এবং মা খালেদা জিয়া ছিলেন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী।
আজ সকাল ১০টায় জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে শপথ নেবেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। তাঁদের শপথ পড়াবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। এরপর তিনি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ পাঠ করাবেন। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এক পরিপত্রে এসব কথা বলা হয়েছে। এরপর প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা নির্বাচন করা হবে।
জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বিকেলে হবে নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের শপথ পাঠ করাবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বিএনপির সূত্র বলেছে, তারেক রহমানের মন্ত্রিসভার আকার হবে ছোট। রেওয়াজ অনুযায়ী, বিএনপির চেয়ারম্যান তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে যাঁদের মনোনীত করবেন, তাঁদের আগেই ফোন দিয়ে শপথ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানাবেন নবনিযুক্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। তাঁদের অনুষ্ঠানে আনার জন্য পাঠানো হবে গাড়ি। মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানও পরিচালনা করবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। নতুন মন্ত্রিসভার শপথের মধ্য দিয়ে দেশ ফিরবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা চাই ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে সামনের দিকে নিয়ে যেতে।’ তাঁদের সরকারের সামনে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতিসহ সব ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানগুলো সব ধ্বংস হয়ে গেছে। এগুলোর বিষয়েও চ্যালেঞ্জ আছে।
সুতরাং, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। জনগণ যে আস্থা আমাদের ওপর রেখেছে, সেই আস্থাটা আমাদের মাথায় থাকবে।’
বিএনপি সর্বশেষ ২০০১ সালে সরকার গঠন করেছিল। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ওই চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হয় ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর। এর আগে তিনি স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পরও স্বল্প সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন খালেদা জিয়া। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর একদল সদস্যের হাতে নিহত হন।
আজ ক্ষমতায় যাত্রা শুরু হচ্ছে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানের। তাঁর নেতৃত্বে ছোট আকারের মন্ত্রিসভায় কারা থাকছেন, তা নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল থাকলেও এ বিষয়ে নিশ্চুপ বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা। মন্ত্রিসভায় কারা থাকছেন—গতকাল সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের জবাবে অপেক্ষা করতে বলেছেন বিএনপির নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ২৯৭টি আসনের আনুষ্ঠানিক ফলে বিএনপি ২০৯টি আসন এবং তার মিত্ররা পেয়েছে ৩টি আসন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বিজয়ী হয়েছে ৬৮টি আসনে। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬টি এবং অন্য শরিকেরা আরও ৩টি আসন পেয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন ৭টি আসনে। ৩০০ আসনের সংসদে সরকার গঠনের জন্য অন্তত ১৫১টি আসনে জয় প্রয়োজন হয়।
তারেক রহমান এবারই প্রথম সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলেন। ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দুটি আসনেই বিজয়ী হয়েছেন। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, দল সরকার গঠন করলে তারেক রহমানই হবেন প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান গতকাল ঢাকা-১৭ আসন রেখে বগুড়া-৬ আসন ছেড়ে দিয়েছেন। ওই আসনে এখন উপনির্বাচনের আয়োজন করবে ইসি। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ঢাকা-১৫ আসনে বিজয়ী হয়েছেন। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জয় পেয়েছেন ঢাকা-১১ আসনে।
ইসি সচিবালয় সূত্র জানায়, আজ সকাল ১০টায় শুরুতে বিএনপির সংসদ সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করাবেন সিইসি। এরপর বিএনপি জোটের নির্বাচিত তিনজনকে শপথ পাঠ করানোর পর দুপুর ১২টায় জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন সিইসি। এরপর জামায়াতের জোটের শরিক দলগুলোর সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানো হবে। এই সময় আরও এগিয়ে আনা হতে পারে। শপথ শেষে সংসদ ভবনের তৃতীয় তলায় রাখা শপথ বইয়ে সই করবেন সংসদ সদস্যরা। এরপর পরিচয়পত্রের জন্য ছবি, আঙুলের ছাপ, ডিজিটাল স্বাক্ষর করবেন তাঁরা। এ জন্য ১০টি বুথ রাখা হয়েছে।
সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানোর জন্য সংসদ ভবনের নিচতলার শপথকক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছে। সংসদ ভবনের নয়তলায় সরকারি ও বিরোধী দলের সভাকক্ষও প্রস্তুত করা হয়েছে। শপথের কার্যক্রম শেষে বিএনপির সংসদীয় দল বৈঠক করবে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা, উপনেতা, চিফ হুইপ নির্বাচন করা হতে পারে। একই সভায় আগামী জাতীয় সংসদের স্পিকার বাছাই করা হতে পারে; যা সংসদের প্রথম অধিবেশনে কণ্ঠভোটে পাস হবে।
প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা নির্বাচনের পরে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিএনপির সংসদীয় দলের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রধানমন্ত্রীর শপথ পড়ানোর জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করা হবে। এর ভিত্তিতে বিকেল চারটায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি।
মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানের জন্য জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা প্রস্তুত করা হয়েছে। শপথ অনুষ্ঠানের মঞ্চের সামনে থাকবে আমন্ত্রিত অতিথিদের বসার চেয়ার। সংসদ ভবন এলাকায় সাজসজ্জা করা হয়েছে। রীতি অনুযায়ী, শপথ অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্যদের পরিবারের এক বা একাধিক সদস্য মূল ভবনে প্রবেশ করেন। তবে এবার নিরাপত্তার কারণে শুধু নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা প্রবেশ করতে পারবেন। অবশ্য দু-একটি ব্যতিক্রম বিবেচনা করা হতে পারে।