বাংলা একাডেমি পরিচালিত ২০২৫ সালের সাহিত্য পুরস্কারের তালিকায় বিশেষ সম্মাননা অর্জন করেছেন কবি, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিজন হাফিজ রশিদ খান। বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর জীবন ও সাহিত্য বিষয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণা ও সামগ্রিক অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে প্রদান করা হচ্ছে সা’দত আলি আখন্দ সাহিত্য পুরস্কার।
পুরস্কারপ্রাপ্তির অনুভূতি জানিয়ে হাফিজ রশিদ খান বলেন, ‘এই পুরস্কারপ্রাপ্তি আমাকেও আনন্দ দিয়েছে। এই প্রেরণা আমার ওপর দেশ, মাটি ও মানুষ নিয়ে ভাবার গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছে বলে মনে করি। বাংলা একাডেমি এই সম্মানটা আমাকে দিল, তাই একাডেমিকে ধন্যবাদ জানাই।’
বাংলা একাডেমির এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আগামী ২৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য একাডেমির ৪৮তম বার্ষিক সাধারণ পরিষদ সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরস্কার প্রদান করা হবে। পুরস্কারের অর্থমূল্য এক লক্ষ টাকা।
হাফিজ রশিদ খানের জন্ম ১৯৬১ সালে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে। বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে হলেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করছেন। পেশাগতভাবে তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত এবং বর্তমানে চট্টগ্রামের দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ পত্রিকায় কর্মরত। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর বাবা ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। ১৯৯৫ সালে তিনি মিলাতুন্নেসা খানমকে বিয়ে করেন। তাঁদের দুই কন্যা নাইসা হাফিজ খান ও রাইসা হাফিজ খান।
আশির দশকে তাঁর সাহিত্যচর্চার শুরু। ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁর প্রথম কবিতা ‘জোসনা কেমন ফুটেছে’ প্রকাশিত হয়। এরপর একে একে প্রকাশিত হয় ‘সুন্দরের দূর্গ’, ‘চোরাগুপ্তা ডুবোপাহাড়’, ‘বিধ্বস্ত ক্যাম্পাস’, ‘ফুলবাড়িয়ার নিহত পলাশগুলি’ এবং দীর্ঘকবিতা সংকলন ‘শোণিত প্রপাত’। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘রাতে আমার পেখম মেলে’ (২০২০), ‘আদিবাসী সাহিত্যের দিগবলয়’ (২০২১) এবং চলতি বছর প্রকাশিত ‘নারীস্থান ও পার্শ্ববর্তী চিত্রকল্প’।
বাংলাদেশে বসবাসরত প্রাক-জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সংস্কৃতি ও জীবনধারা তাঁর সাহিত্য ও গবেষণার প্রধান বিষয়। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের তরুণ-প্রবীণ সাহিত্যকর্মীদের সম্পাদিত বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে তাঁর অসংখ্য কবিতা ও লেখা প্রকাশিত হয়েছে।
লেখালেখির শুরুর দিকে তিনি রেনেসাঁস, ধানের শীষে গান ও বৃষ্টি নামের সাহিত্যপত্রিকা সম্পাদনা করেন। পরবর্তীতে ১৯৯১ সাল থেকে সমুজ্জল সবাতাস এবং ১৯৯৩ সাল থেকে পুষ্পকরথ পত্রিকা সম্পাদনা করে আসছেন। পুষ্পকরথ সম্পাদনার জন্য তিনি কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র থেকে লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৬ সালে প্রবন্ধসাহিত্যে অবদানের জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক একুশে সাহিত্য পুরস্কারসহ একাধিক সম্মাননায় ভূষিত হন।
৮ পুরস্কার পেলেন ৯ জন
এবার বাংলা একাডেমি পরিচালিত ৮টি পুরস্কারের মধ্যে তারিক আনাম খানের পাশাপাশি সাহিত্য, কবিতা, বিজ্ঞানসাহিত্য, অনুবাদ ও কথাসাহিত্যে অবদানের জন্য আরও কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সাহিত্যিক মোহম্মদ বরকতুল্লাহ প্রবন্ধসাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন অধ্যাপক মনসুর মুসা (ভাষাভিত্তিক গবেষণার মূল্যায়নে)।
মেহের কবীর বিজ্ঞানসাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন খসরু চৌধুরী (প্রকৃতি ও বিজ্ঞান – চর্চায় সামগ্রিক মূল্যায়নে)। মযহারুল ইসলাম কবিতা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন সানাউল হক খান (বাংলা কবিতায় সামগ্রিক মূল্যায়নে)। সা’দত আলি আখন্দ সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন হাফিজ রশিদ খান (বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর জীবন ও সাহিত্য বিষয়ে গবেষণার মূল্যায়নে)।
আবু রুশ্দ সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন শিবব্রত বর্মন (অনুবাদ-সাহিত্যে অনন্য অবদানের মূল্যায়নে)। হালীমা-শরফুদ্দীন বিজ্ঞান পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন সফিক ইসলাম গণিতের রাজ্যে আনন্দভ্রমণ গ্রন্থের জন্য (গণিতকে সহজবোধ্য ও উপভোগ্যভাবে উপস্থাপনের জন্য)। রাবেয়া খাতুন কথাসাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন সুব্রত বড়ুয়া (কথাসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের মূল্যায়নে)।
এছাড়াও অনূর্ধ্ব ৪৯ বছর বয়সী লেখকদের মধ্যে ২০২৪ সালে প্রকাশিত সিসিফাস শ্রম গল্পগ্রন্থের মূল্যায়নে ‘রাবেয়া খাতুন কথাসাহিত্য পুরস্কার ২০২৫’- এ ভূষিত হয়েছেন আনিসুর রহমান।