বন্ধু কি খবর বল…?— এই একটি বাক্যেই যেন থমকে গেল সময়। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বহু বছর আগের স্কুলজীবনে ফিরে গেলেন এসএসসি ’৯১ ব্যাচের বন্ধুরা। চুলে পাক, বয়সের ভার থাকলেও চোখেমুখে ছিল কৈশোরের সেই চেনা উচ্ছ্বাস। সময়ের কাছে বন্ধুত্ব যে হার মানে না, তারই জীবন্ত প্রমাণ হয়ে থাকল এসএসসি ’৯১ চট্টগ্রাম ক্লাব লিমিটেড’র দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি আয়োজন।
চট্টগ্রামের বন্ধুদের সম্মিলিত উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই সংগঠনের দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান গত শনিবার ঐতিহ্যবাহী চিটাগাং ক্লাবে অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ১২ ঘণ্টাব্যাপী এই আয়োজনে ফুটে ওঠে ৩৪ বছরের পুরোনো স্মৃতি, আবেগ আর নির্ভেজাল বন্ধুত্বের গল্প।
সকাল ৯টায় সদস্যদের আগমন, গিফট ও কুপন সংগ্রহের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি শুরু হয়। সকাল ১০টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, গীতা পাঠ ও ত্রিপিটক পাঠের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যুক্ত হয় দেশপ্রেমের আবহ।
অনুষ্ঠানে প্রয়াত বন্ধুদের স্মরণে শোক প্রস্তাব উপস্থাপন, মোনাজাত ও এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। এই আবেগঘন মুহূর্তে অনেকের চোখ ছলছল করে ওঠে— কারণ বন্ধুত্বের এই দীর্ঘ পথচলায় কেউ কেউ আর ফিরে আসেননি।
এরপর স্বেচ্ছাসেবক প্যানেল ও উপদেষ্টা পরিষদের পরিচিতি পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। আহ্বায়ক ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ আলাউদ্দিন আলো শুভেচ্ছা বক্তব্যে বন্ধুত্বের শক্তি, সময়ের মূল্য এবং সবাইকে একত্রে রাখার প্রত্যয়ের কথা তুলে ধরেন।
পরবর্তীতে শুরু হয় স্মৃতিচারণ পর্ব। বহুদিন পর একে অপরের সামনে দাঁড়িয়ে কেউ হারিয়ে যাওয়া স্কুলজীবনের গল্পে ফিরে যান, কেউ আবার নীরবে চোখের কোণে জমে ওঠা অশ্রু লুকিয়ে রাখেন। ছবি তোলা, কাঁধে হাত রেখে আড্ডা আর প্রাণখোলা হাসিতে মিলনমেলা পরিণত হয় স্মৃতির এক জীবন্ত অ্যালবামে।
দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক আয়োজনে সংগীত পরিবেশন করেন পারভেজ, বিশ্বজিৎ, শেখ মো. শহিদুজ্জামান ও লিংকন। বন্ধু সুজন দেবের কন্যা অনন্যা দেব প্রাচীরের নৃত্য পরিবেশনা সবার প্রশংসা কুড়ায়। বান্ধবীদের সংগীত পরিবেশন করেন ফাতেমা জোহরা, ফেন্সি, মৌসুমী ও নিপু।
মধ্যাহ্নভোজের পর বিকেলজুড়ে চলে মনোজ্ঞ পরিবেশনা। রত্নার বিশেষ পারফরম্যান্স, বন্ধু ওসমানের একক গান এবং অতিথি বন্ধু হাসান ফারুক (জিপিডি)-এর বক্তব্য অনুষ্ঠানে নতুন মাত্রা যোগ করে। ঢাকা থেকে আগত এসএসসি ’৯১ ব্যাচের শিল্পীরা— উত্তম, হিমেল, সুজন, আসাদ, লিটনসহ অনেকেই কণ্ঠে গানের মায়াজাল ছড়ান। জুনি চাকমার ডুয়েট পারফরম্যান্স এবং পাহাড়ি নৃত্য ছিল চোখ ধাঁধানো।
এই বর্ষপূর্তি আয়োজনে সারা দেশ থেকে সাড়ে ৮শ’ বন্ধু রেজিস্ট্রেশন করেন এবং প্রায় সবাই উপস্থিত ছিলেন। চন্দনাইশ, রাঙ্গুনিয়া, মিরসরাই ও পটিয়া থেকে সর্বাধিক বন্ধু অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের টি-শার্ট, আকর্ষণীয় ব্যাগ, চার রঙের স্মরণীয় স্যুভেনির, কলম ও ব্যাজ উপহার দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠান সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করেন সাখাওয়াত হোসেন ও সাজ্জাদুল ইসলাম চৌধুরী। তত্ত্বাবধানে ছিলেন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও স্বেচ্ছাসেবকরা। রাতে র্যাফেল ড্র এবং প্রধান সমন্বয়কারী মোহাম্মদ শাখাওয়াত হোসেনের সমাপ্তি বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি ঘটে।
এই আয়োজন প্রমাণ করেছে— বয়স বাড়ে, সময় বদলায়, কিন্তু বন্ধুত্ব কখনো পুরোনো হয় না। এসএসসি ’৯১ চট্টগ্রাম ক্লাব লিমিটেড’র দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি হয়ে থাকল জীবনের পাতায় লেখা এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।