বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বা লবণাক্ত জলাশয়ময় বন ‘সুন্দরবন’। একাডেমিক ফিল্ড-ওয়ার্কের অংশ হিসেবে সম্প্রতি ‘প্রকৃতির বিস্ময়’ সুন্দরবন দেখার সুযোগ হলো আমাদের। আমরা বলতে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত পর্যবেক্ষক দলের। চারদিনের এই শিক্ষাসফরে সুন্দরবনের নয়টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফিল্ড ভিজিট পরিচালনার সুযোগ পাই আমরা। যার মধ্যে ছিল—আন্ধারমানিক, ডিমের চর, কটকার জামতলা, কটকা সমুদ্রসৈকত, হিরণ পয়েন্ট, দুবলার চর, কোকিলমনি, করমজল ও কচিখালী।
আমাদের জন্য এটি শুধু শিক্ষাসফর ছিল না, প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখার, গভীরভাবে অনুভব করার অনন্য এক সুযোগও ছিল।
পাঠ্যবই পড়ে ও শ্রেণিকক্ষে আলোচনা থেকেই সুন্দরবন নিয়ে আমাদের স্মৃতিতে তৈরি হয়েছিল অন্যরকম এক সৌন্দর্য। কিন্তু সুন্দরবনে পা রাখতেই সেই সৌন্দর্য ছাড়িয়ে গিয়েছিল আমাদের কল্পনাকেও। এই বিস্ময় কোনো পাঠ্যবইয়ে ধারণ করার নয়; এ শুধু অনুভবের। যে অনুভূতি নিজ চোখে না দেখলে ভাষায় প্রকাশ অসম্ভব।
সুন্দরবন আমাদের সামনে এসেছে বিস্ময় হয়ে। যেখানে প্রতিটি নদী-খাল, জোয়ার-ভাটা, শ্বাসমূলীয় বন ও বন্যপ্রাণী মিলেমিশে যেন বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার এক অদৃশ্য ঢাল গড়ে তুলেছে। এই বনাঞ্চল ঘিরে টিকে আছে লাখো উপকূলীয় লোকের জীবন-জীবিকা। এই ভ্রমণ আমাদের কাছে, গভীর উপলব্ধির এক অনন্য যাত্রা। যে যাত্রা শিখিয়েছে— সুন্দরবন বাঁচলে দেশ বাঁচবে, এটি সংরক্ষণ করা মানে আমাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখা।
যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা স্বপ্নদ্বীপ
ইউনেস্কো ঘোষিত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট সুন্দরবন। এটি যেন এক সবুজ দুর্গ। যার মায়া ছুঁয়ে যায় হৃদয়ের গভীরতম স্তরকে। কচিখালি ও হিরণ পয়েন্টের নির্জনতা, ঘন ম্যানগ্রোভের ফাঁকে বন্যপ্রাণীর নীরব চলাচল, ঝিলমিল করা জলরাশি, আকাশছোঁয়া বৃক্ষরাজি— প্রকৃতি যেন তার রূপের পুরোটাই দিয়ে দিয়েছেন এখানে। কটকা জামতলা ও কটকা সমুদ্রসৈকতের অসীম বালুচর, তরঙ্গের গর্জন আর দুর্লভ পাখিদের ছুটোছুটি— এক কথায় অসাধারণ।
দুবলার চরে যেতেই চোখে পড়ে জেলেদের কর্মযজ্ঞ। এখানেই সূর্যোদয়ের প্রথম আলো পানির আয়নায় আঁকে রঙিন চিত্রকর্ম। যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা কোনো স্বপ্নদ্বীপ।
আন্ধারমানিক থেকে কোকিলমনি পর্যন্ত জলপথ, জোয়ার-ভাটার খেলাঘর, শান্ত নদীর বুক চিরে নৌযানের ধীর যাত্রা, আর মাথার ওপর সাদা বকের সারি— সবকিছুই স্মৃতিতে থাকবে আজীবন।
প্রকৃতির অদৃশ্য রক্ষাকবচ, সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
সুন্দরবন শুধু প্রকৃতির বিস্ময় নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, জীবিকা ও সংস্কৃতির চালিকা শক্তিও। যা দেশের সামগ্রিক টেকসই উন্নয়নের ভিত্তিকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে রেখেছে।
নদী–খাঁড়ি, মিঠা–নোনা পানির মেলবন্ধনে জন্ম নেওয়া বিশাল মৎস্য সম্পদ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সমৃদ্ধ করেছে অর্থনীতি। সুন্দরবন থেকে মধু, মোম ও গোলপাতা সংগ্রহের শতাব্দী-প্রাচীন ঐতিহ্য আজও বাঁচিয়ে রেখেছে অসংখ্য বাওয়ালি ও মৌয়ালকে।
সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্ট, কচিখালি, করমজল ও কটকার মতো মনোমুগ্ধকর স্পটগুলো আন্তর্জাতিক পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করে দেশের রাজস্ব বৃদ্ধির নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে।
সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কার্বন সিঙ্ক হিসেবে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার বাড়তি ঝুঁকি থেকে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলকে প্রতিনিয়ত সুরক্ষিত রাখছে। এ যেন প্রকৃতির অদৃশ্য রক্ষাকবচ। অর্থনৈতিক অবদানের পাশাপাশি এই অরণ্য আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গভীর শেকড়। সুন্দরবন ঘিরে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য লোকগল্প, আচার ও শিল্পরূপ; যা মানুষের সঙ্গে বন্ধন গড়ে তুলেছে প্রকৃতির। এক কথায় বলতে গেলে, সুন্দরবন নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ‘ইকোলজিক্যাল ইঞ্জিন’। যেটি অর্থনীতি, পরিবেশ ও সংস্কৃতির অনন্য সমন্বয়ক।
সুন্দরবনের বুকে রক্তক্ষরণ
সুন্দরবন ভ্রমণ আমাদের অনন্ত আনন্দ দিয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে এখানকার নয়টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর ক্রমবর্ধমান সংকটের যে গভীর ক্ষতচিহ্ন লক্ষ্য করেছি, তা এই অনন্য ম্যানগ্রোভ অরণ্যের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও উজানের পানিপ্রবাহ হ্রাসের ফলে মাটি ও পানিতে লবণাক্ততার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বিশেষত সুন্দরীগাছের জীবনচক্রকে বিপর্যস্ত করছে। অপরিকল্পিত পর্যটন, নৌযানের তেল নিঃসরণ এবং প্লাস্টিক বর্জ্য নদী ও খাঁড়ির জলকে ক্রমাগত দূষিত করে তুলছে।
রয়েল বেঙ্গল টাইগারের পদচিহ্ন দেখা গেলেও সরাসরি উপস্থিতির বিরলতা, কুমির ও হরিণের সংখ্যা হ্রাসসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর সংকট জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয়কেই স্পষ্ট করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অবৈধ কাঠ সংগ্রহ, অতিমাত্রায় মাছ শিকার ও অনিয়ন্ত্রিত নৌযান চলাচল। এসব পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে সুন্দরবনের প্রাণপ্রবাহকে দুর্বল করছে।
ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বৃদ্ধি, তাপমাত্রার উর্ধ্বগতি, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনের মতো জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব এই অরণ্যের ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
আমাদের এই শিক্ষাসফরে সুন্দরবনের অপার সৌন্দর্য যেভাবে ধরা পড়েছে, তেমনি সামনে এসেছে প্রকৃতির নীরব কান্না। কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া সুন্দরবনের জীবনরেখা দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে— আমাদের পর্যবেক্ষণে বারবার এটিই সামনে এসেছে।
যেভাবে বাঁচাতে হবে সুন্দরবনকে
সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখনই জরুরি পদক্ষেপ— সমাধানের পথ সামনে রেখেই এগোতে হবে। সুন্দরবনকে বাঁচাতে হবে। সুন্দরবনকে অস্তিত্ব সংকট থেকে রক্ষা করতে হলে এখনই সমন্বিত, বৈজ্ঞানিক ও কঠোর ব্যবস্থাপনা প্রণয়ন জরুরি। আমাদের পর্যবেক্ষণে অরণ্যের যে ক্ষত চোখে পড়েছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ক্ষত যে আরো বাড়বে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
পর্যবেক্ষণে বেশকিছু পদক্ষেপ দ্রুত নেওয়া জরুরি বলে আমাদের মনে হয়েছে। অবৈধ কাঠ সংগ্রহ, অতিমাত্রায় মাছ ধরা, প্লাস্টিক বর্জ্য ও তেল দূষণের বিরুদ্ধে কঠোর পরিবেশ আইন প্রয়োগ এবং নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। পর্যটন ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকীকরণে মাধ্যমে নির্দিষ্ট নৌপথ ব্যবহার, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, সীমিত পর্যটন এবং সুরক্ষিত জোন বাস্তবায়ন করতে হবে। এটি নিশ্চিত করা গেলে প্রকৃতির নীরবতা ও বন্যপ্রাণীর আবাস রক্ষা পাবে।
লবণাক্ততা মোকাবেলায় বৈজ্ঞানিক বনায়ন ও লবণ সহনশীল প্রজাতি রোপণের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে ড্রোন, ক্যামেরা ট্র্যাপিং ও জিপিএসভিত্তিক মনিটরিং ব্যবহার করে আধুনিক নজরদারি জোরদার করা জরুরি।
স্থানীয় জনগণের জীবিকা ও অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে টেকসই ব্যবস্থাপনার নীতিও থাকতে হবে। যাতে তারা বনরক্ষার সক্রিয় অংশীদার হয়ে উঠেন। জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবেলায় বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিলের সহায়তায় উপকূলীয় প্রকৃতি পুনঃসংরক্ষণ ও প্রতিরোধমূলক অবকাঠামো গড়ে তোলাই হতে পারে সুন্দরবনের জন্য একটি কার্যকর ভবিষ্যৎ রোডম্যাপ।
পর্যবেক্ষক দল : মৃগাঙ্ক
সদস্য : উম্মে কুলছুম রীমা, তিথি মল্লিক, ইরিন তাসনিম, উছাইওয়াং মার্মা
ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়