নির্বাচন ঘিরে চট্টগ্রামে প্রচার প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থী ও দলীয় নেতাকর্মীরা। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি সংঘাত-সহিংসতার শঙ্কা থাকলেও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটি উৎসবমুখর নির্বাচনের। এবারের নির্বাচনে নগরের ভোটাররা দল কিংবা প্রতীকের চেয়ে প্রার্থী বাছাইয়ে ব্যক্তিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। সেইসাথে নানা রকম সমস্যা সমাধানে আগামীর সরকার নিয়ে ইতিবাচক স্বপ্নও বুনছেন তারা। প্রার্থী বাছাইয়ে নগরের জলাবদ্ধতা, যানজট ও চাঁদাবাজির সমস্যা সমাধানের বিষয়গুলো সামনে আনছেন নগরবাসী।
চট্টগ্রামের নালাপাড়া বাজারে কথা হয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আসলাম হোসেনের সাথে। প্রায় দেড় যুগ ধরেই চট্টগ্রাম শহরে তার বসবাস। তিনি বলেন, দেশের প্রধান বাণিজ্যিক শহর চট্টগ্রামে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। বছরের পর বছর ধরে বিষয়টির সমাধান কোনো সরকার করতে পারেনি।
নগরের বাসিন্দারা বলছেন, নগরীর পানি নিষ্কাশনের জন্য যে খাল বা নালাগুলো ছিল সেগুলোর অনেকাংশেই দখল হয়ে গেছে। যে কারণে বৃষ্টিতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা তৈরি হয় বর্ষা মৌসুমসহ বছরের বিভিন্ন সময়। এতে করে প্রতিবছর নালা-নর্দমায় পড়ে মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
হাফিজা আক্তার নামে এক নারী গণমাধ্যমকে বলেন, বাড়ির পাশের একটি নর্দমার কারণে বৃষ্টি হলেই পুরো বাড়িঘর তলিয়ে যায় তার। এ নিয়ে তিনি সমাধানের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কোনো সমাধান এখনো পাননি।
এদিকে গত কয়েক বছরের চট্টগ্রামের যানজট নিরসনে ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। কিন্তু এতে খুব বেশি সমাধান আসেনি। যে কারণ যানজট নিরসনে স্থায়ী সমাধানের কথাও বলছিলেন ভোটারদের অনেকেই।
কেউ কেউ আবার নাগরিক ভোগান্তির পাশাপাশি চাঁদাবাজির বিষয় নিয়েও কথা বলেছেন। তাদের অনেকেই বলেছেন, এখানে কেউ নতুন করে দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করতে গেলে চাঁদা গুনতে হয়। পার্কিং স্পেস থেকে শুরু করে বাজারের বিভিন্ন দোকানেও চলে চাঁদাবাজি। যা গত দেড় বছরে আরো বেড়েছে বলে জানান, নালাপাড়া বাজার এলাকার ভোটার মো. মহিউদ্দিন।
তিনি বলেন, আমরা চাই এমন একজন ভোটে জিতুন যিনি চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে এলাকার মানুষকে রক্ষা করবে। বিশেষ করে গত কয়েক মাসে নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনায়ও চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা দেখা গেছে।
জানা গেছে, প্রায় ৬৬ লাখ ভোটারের চট্টগ্রাম জেলায় মোট সংসদীয় আসন রয়েছে ১৬টি। মেট্রোপলিটন শহরের বাইরে চট্টগ্রামের রাজনীতি দুই অঞ্চলে বিভক্ত। কর্ণফুলী নদীর এক প্রান্ত থেকে কক্সবাজার জেলার এই সীমান্ত পর্যন্ত দক্ষিণ চট্টগ্রাম এবং মিরসরাই থেকে রাঙ্গুনিয়া পর্যন্ত উত্তর চট্টগ্রাম। ৬০ বর্গমাইলের সিটি কর্পোরেশন (চসিক) এলাকায় রয়েছে তিনটি ( চট্টগ্রাম– ৯, ১০ ও ১১) সংসদীয় আসন। এছাড়া চট্টগ্রাম–৮, চট্টগ্রাম–৪ ও চট্টগ্রাম–৫ আসনের আংশিক পড়েছে চসিক এলাকায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে চসিক এলাকায় সংসদ সদস্যদের ব্যাপকভাবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করার সুযোগ সীমিত। সাধারণত, সংসদ সদস্যগণ তাদের চাহিদা সিটি কর্পোরেশনকে অবহিত করেন এবং কর্পোরেশন সেই চাহিদার ভিত্তিতে প্রকল্প তৈরি করে। চসিকের বাইরে নগরের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে আছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। অর্থাৎ সিডিএ ও চসিক যেভাবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করতে পারবে সংসদ সদস্যদের সেভাবে সুযোগ নেই।
এরপরও নগরকে ঘিরে শহর এলাকার সংসদীয় আসনগুলোর প্রার্থীরা দিয়েছেন নানা রকম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। চট্টগ্রাম–৮ আসনের বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ চান্দগাঁওয়ে গণসংযোগ চলাকালে এলাকার প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি কর্পোরেশন ও সিডিএ’র সমন্বয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করার প্রতিশ্রুতি দেন। একই আসনের এনসিপি প্রার্থী জোবাইরুল হাসান আরিফ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
চট্টগ্রাম–৯ আসনের বিএনপি প্রার্থী আবু সুফিয়ান বাকলিয়া এলাকায় গণসংযোগকালে বলেন, জলাবদ্ধতা, ড্রেনেজ সমস্যা, সরু রাস্তাঘাট, বিশুদ্ধ পানির অভাব, মাদকসহ নানাবিধ সমস্যা সমাধানকে অগ্রাধিকারে রাখা হবে। এই আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. একেএম ফজলুল হক শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ারও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
এদিকে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে নিজ নির্বাচনী এলাকায় একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক হাসপাতাল গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন চট্টগ্রাম–১০ আসনের বিএনপি প্রার্থী সাইদ আল নোমান। চট্টগ্রাম–১১ আসনের বিএনপির প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে চট্টগ্রামকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।