চট্টগ্রাম-১৪ আসনের নির্বাচন পরিস্থিতি এবার একেবারে ভিন্ন। এ আসনে প্রার্থীদের বিজয়ের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র কিছু সূচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করছেন রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা । এখানে কেউ বিদ্রোহী বা অঞ্চলকেন্দ্রিক প্রার্থী। আবার কেউ আছেন পারিবারিক বা ব্যক্তিগত ইমেজধারী। আবার কেউ রয়েছেন জোট বা দলীয় ব্যানারওয়ালা। এমন পরিস্থিতিতে ভোটের হিসাব কোন সমীকরণে হবে? কে হাসবেন শেষ হাসি-সেটাই এখন দেখার বিষয়।
ইমেজধারী প্রার্থী :
এ আসনে এলডিপি থেকে জামায়াত জোটের হয়ে নির্বাচন করছেন অধ্যাপক মো. ওমর ফারুক। তিনি এলডিপি সভাপতি (অব.) কর্ণেল অলি আহামদ বীর বিক্রমের ছেলে। তার ক্ষেত্রে জোট,দল বা ব্যক্তি পরিচয়ের চেয়ে বড় তিনি কর্ণেল অলির ছেলে। ২০০৮ সাল পর্যন্ত টানা ছয়বার সংসদ সদস্য ছিলেন কর্ণেল অলি। অলি আহামদ বিএনপি সরকারের আমলে ছিলেন যোগাযোগমন্ত্রী। ওইসময় চন্দনাইশ উপজেলাসহ পুরো আসন এলাকা তথা দক্ষিণ চট্টগ্রামে ব্যাপক সড়ক উন্নয়ন করেছেন তিনি। পরে নানা কারণে বিএনপি ছেড়ে এলডিপি গঠন করলেও এখানে অলির জনপ্রিয়তা এখনো আকাশচুম্বী। ৫ অগাস্টের পর থেকে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে তিনি এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। বাবার জনপ্রিয়তা ও ইমেজ জামায়াত জোটের প্রার্থী ওমর ফারুকের জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে-মনে করছেন ভোটাররা।
আবার আলোচিত,সমালোচিত বা বিতর্কিত যা-ই হোক। বিএনপির প্রার্থী জসিম উদ্দিন আহমদ এ সূচকে ওমর ফারুকের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বি। ২০২৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চন্দনাইশ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু আহমেদকে পরাজিত করে চেয়ারম্যান হয়েছিলেন জসিম উদ্দিন। নিজ দল সরকারে থাকলেও জসিমের প্রভাব প্রতিপত্তি আর ম্যাকানিজমের কাছে পরাস্ত হয়েছিলেন আবু আহমদ। অবশ্য ওইসময় অলি আহমদ ও আওয়ামী লীগের একটি অংশ আবু আহমদের বিপক্ষে কাজ করেছিল বলে শোনা যায়। এবার আর সে সুযোগ পাচ্ছেন না জসিম উদ্দিন।
এদিকে, এ আসনে বৃহত্তর সুন্নি জোট সমর্থিত ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী মাওলানা সোলাইমান ফারুকী চন্দনাইশ উপজেলা পরিষদের তিনবারের নির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান। তিনি গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ’র চন্দনাইশ কাফন-দাফন টিমের সমন্বয়ক। তারও কিছু ভোট রয়েছে এলাকায়।
এলডিপি প্রার্থী ওমর ফারুকের প্রধান নির্বাচনি সমন্বয়ক ইয়াকুব বলেন, ২০০৮ সালে তিনি আওয়ামী লীগ বিএনপি-জামায়াত জোটের বাইরে গিয়ে এলডিপি এককভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন কর্ণেল অলি আহামদ। অলি আহামদের মত তার ছেলেও এ আসনে জিতবেন, ইনশাল্লাহ। বাবার প্রতিনিধি হয়ে ছেলে এলাকাবাসীর সেবা করবেন, সে পরিকল্পনায় ছেলেকে প্রস্তুত করেছেন তিনি। মানুষ সবসময় যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেয়।
আঞ্চলিকতা ও বিদ্রোহী প্রার্থী :
চট্টগ্রাম-১৪ আসনটি চন্দনাইশ এবং সাতকানিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত। পুরো চন্দনাইশ উপজেলা আর সাতকানিয়ার কেউচিয়া, কালিয়াইশ, বাজালিয়া, ধর্মপুর, পুরাণগড়, খাগরিয়া ইউনিয়ন মিলে এ আসন। এখানে ভোটার ৩ লাখ ১৩ হাজার ৪৩১ জন। এর মধ্যে প্রায় ৯০ হাজার ভোটার সাতকানিয়ার ছয়টি ইউনিয়নে। আর বাকি ভোটার চন্দনাইশ উপজেলার। আঞ্চলিকতার মাপকাঠিতে এখানে কোন প্রার্থী কোন এলাকার সেটিও একটি ফ্যাক্টর। এখানে দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মিজানুল হক চৌধুরী ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি শফিকুল ইসলাম রাহী এবার নির্বাচন করছেন। তারা একদিকে বিদ্রোহী প্রার্থী আবার অন্যদিকে আঞ্চলিক প্রার্থীও। মিজানুল হক চৌধুরীর বাড়ি সাতকানিয়ার বাজালিয়া ইউনিয়ন।তিনি ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। আর শফিকুল ইসলাম রাহীর বাড়ি খাগড়িয়া ইউনিয়ন। এবার মনোনয়ন না পাওয়ায় তারা স্বতন্ত্র হয়েই নির্বাচন করছেন। দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও দুই প্রার্থী স্ব স্ব এলাকার ভোট টানবেন বলে ধারণা ভোটারদের। সুতরাং বিএনপির প্রার্থী জসিমের বাক্সে দলীয় ভোট কমবে এটাই স্বাভাবিক।
বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী শফিকুল ইসলাম রাহী বলেন, ভোটাররা এখন সচেতন। এখন মানুষ মার্কার পাশাপাশি প্রার্থীকেও পছন্দ করে। এলাকার মানুষ আমাকে ভালবাসে। তাদের সুখে দুঃখে আমি ছিলাম আছি থাকব। বিজয়ী হলে দল তাকে আবার কাছে টেনে নেবে বলে বিশ্বাস করেন তিনি।
দলীয় বা জোট প্রার্থী :
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী জসিম উদ্দিন আহমদ। তাকে নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হামলার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছিল ঢাকায়; সেই মামলায় তিনি কারাগারেও ছিলেন। আলোচনা আছে, জসীম ছিলেন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের ব্যবসার অংশীদার। কোনদিন বিএনপি রাজনীতি না করেও এবার দল তাকে মনোনয়ন দেওয়ায় বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঝে অসন্তোষ রয়েছে। সে হিসেবে চট্টগ্রাম-১৪ আসনে বিএনপির ভোট তিনভাগে বিভক্ত। একভাগ জসিম উদ্দিনের। একভাগ কর্ণেল অলির ছেলে ওমর ফারুকের। আরেক ভাগ বিদ্রোহী প্রার্থীর। তবুও ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে এমপি হওয়ার দৌঁড় দিয়েছেন জসিম উদ্দিন।
বিএনপি প্রার্থী জসীম উদ্দিনের প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারী ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহ সভাপতি এমএ হাশেম রাজু বলেন, স্রোতের বিপরীতে গিয়ে কেউ টিকে থাকতে পারে না। দলের বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলেও সেটা কোনো প্রভাব ফেলবে না। সাধারণ মানুষ ধানের শীষের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।