চোখে আলো নেই— কিন্তু স্বপ্নে অন্ধকারও নেই। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা মানুষকে দাঁড় করায়। সেই বিশ্বাস আঁকড়ে ধরেই রিকশাচালকের কন্যা মাফিয়া খাতুন পৌঁছে গিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে স্নাতক শেষের দোরগোড়ায়। কিন্তু মাস্টার্সে ভর্তির মুহূর্তে এসে স্বপ্নটা হঠাৎ থমকে যাচ্ছিল শুধু অর্থাভাবে।
ঠিক তখনই (৫ ফেব্রুয়ারি) মাফিয়া হাজির হন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে। সারাদেশে ‘মানবিক ডিসি’ হিসেবে পরিচিত জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞার সামনে তুলে ধরেন নিজের জীবনের না বলা গল্প। নির্বাচনী ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি মাফিয়াকে সময় দেন এবং সরকারি নানা সীমাবদ্ধতার মাঝেও আর্থিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন। তার এই সহায়তায় নতুন করে আশার আলো দেখছে মাফিয়ার উচ্চশিক্ষার পথ।
মাফিয়ার কথা শুনে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘একজন মেধাবী শিক্ষার্থী, তাও আবার বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন—শুধু টাকার অভাবে মাস্টার্সে ভর্তি হতে পারবে না, এটা জেলা প্রশাসক হিসেবে মেনে নেওয়া কষ্টকর।’
সহায়তা পাওয়ার পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি মাফিয়া। তিনি বলেন, ‘এত ব্যস্ততার মাঝেও ডিসি স্যার আমাকে সময় দিয়েছেন। উনি মানবিক না হলে নিশ্চয়ই আমার মতো মানুষের পাশে দাঁড়াতেন না।’
নওগাঁ জেলার রানীনগর উপজেলার খটেশ্বর গ্রামের বাসিন্দা মাফিয়া খাতুন জন্ম থেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। বাবা আমজাদ ফকির রিকশা চালিয়ে আর মা ছামেনা বেগম বিভিন্ন বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগানোর চেষ্টা করতেন। ২০২০ সালে বাবার মৃত্যু পরিবারটির জীবনে নেমে আনে নতুন অন্ধকার। চার সন্তানকে নিয়ে একা হয়ে পড়েন ছামেনা বেগম।
মাফিয়ার সংগ্রাম ছিল দ্বিগুণ কঠিন। তার ভাই মোহাম্মদ আশিকও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। আশিক বর্তমানে সিরাজগঞ্জের একটি কলেজে এইচএসসি পর্যায়ে পড়াশোনা করছে। সীমাহীন দারিদ্র্যের মাঝেও দুই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সন্তানের শিক্ষার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন মা ছামেনা বেগম। তবে একার আয়ে সেই লড়াই দিন দিন অসম হয়ে উঠছিল।
এরপরও থেমে যাননি মাফিয়া। মানুষের কাছে ধার করে, কষ্ট চেপে রেখে তিনি পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। বরিশালের এ আর এস উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ঢাকার বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগে। সেখান থেকেই কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক শেষ করেন তিনি। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামসুন্নাহার হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মাফিয়া।