ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র এক দিন বাকি। দীর্ঘ ১৭ বছরের একদলীয় শাসনের পর এবার ভোট দিতে পারছে দেশের সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে অনেক তরুণ-তরুণীর জন্য এটি প্রথম ভোট। সাধারণ মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন নতুন রাষ্ট্রনায়ক ও জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য। একই সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য আয়োজিত গণভোটও নজর কাড়ছে। তাই শহর থেকে গ্রামে ছুটছেন ভোটাররা। ভোটের জন্য এমন বাড়ি ফেরা আগে কখনও হয়নি। এ যেন ঈদের ঘরে ফেরা!
শুধু যে ভোটাররা গ্রামের পথে তা কিন্তু নয়। পরিবার পরিজন নিয়ে বাড়ি ফিরছেন তারা। তবে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ কিংবা আওয়ামী লীগের অনেক ভোটার রয়েছেন এই আয়োজন থেকে দূরে। মামলা কিংবা স্থানীয় বিরোধীদের আক্রোসের ভয়ে ঘরে ফেরা হচ্ছে না তাদের। যদিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নৌকাহীন ভোটের বিরোধীতা করে গণভোটে ‘না’র পক্ষ নিতে দেখা গেছে অনেককে। সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ঈদের আমজ বিরাজ করছে অনলাইন-অফলাইন ও শহরে থেকে গ্রামে।
মঙ্গলবার সরজমিনে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে ঘরমুখো মানুষের তড়িঘড়ির চিত্র। আগামীকাল বুধবার শেষ কর্মদিবস হওয়ার কথা থাকলেও অনেকেই আগেভাগেই পরিবার নিয়ে রওনা দিয়েছেন। নগরীর দামপাড়া, কর্নেলহাট, একে খান, অলংকার, বাস টার্মিনাল, এক কিলোমিটারসহ অন্যান্য স্টেশনের বাস কাউন্টারগুলোতে দেখা গেছে বাড়তি ভিড়।
বাস কাউন্টারের চেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেছে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে। সকাল থেকে সব কয়টি ট্রেনে ছিল অতিরিক্ত যাত্রী। এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি এবং খাগড়াছড়ি জেলায় যাতায়াতের বাস চট্টগ্রাম নগরীর অক্সিজেন মোড় থেকে ছাড়ে। নগরীর অক্সিজেন বাস স্ট্যান্ডেও বিপুলসংখ্যক মানুষ গাড়ির জন্য অপেক্ষায় আছেন—এমন চিত্র দেখা গেছে।
ভোটাররা বলছেন, অনেক বছর পর একটি উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দেয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই পরিবার পরিজন নিয়ে বাড়ি ফিরছেন তারা। নিজের যেমন ভোট দেওয়া হবে তেমনি সন্তানদের গণতেন্ত্রের সৌন্দর্য পরখ করাতে চান অনেকে।
মেহেরুন নাহার নামে এক চাকরিজীবী বলেন, অনেক বছর পর এমন উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। পরিবার নিয়ে বাড়ি ফিরছি, নিজের ভোটের সঙ্গে সন্তানদের গণতন্ত্র শেখাতে চাই।
সাদিকুর রহমান নামে এক তরুণ বলেন, এটা আমার প্রথম ভোট। আমি চাই দেশ ও এলাকর জন্য যোগ্য নেতা নির্বাচিত হোক। তাই আজই বাড়ি ফিরছি। তিনি বলেন, নির্বাচন মানে শুধু ভোট নয়, এটা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য একটি দায়িত্বও।
এদিকে ঘরমুখো মানুষের বাড়তি চাপ সামলাতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন গণপরিবহন সংশ্লিষ্ট ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের ম্যানেজার আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে আজ সকাল থেকে বেশি যাত্রী ছিল। বিকালের ট্রেনগুলোতে যাত্রী সংখ্যা আরও বাড়বে।
চট্টগ্রাম স্টেশনে দায়িত্বরত রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ইন্সপেক্টর আমান উল্লাহ বলেন, চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে যেন আজ সকাল থেকে ঈদের আমেজ বিরাজ করছে। সকাল থেকে চট্টগ্রাম স্টেশন থেকে যেসব ট্রেন ছেড়ে গেছে সবগুলোতে অতিরিক্ত যাত্রীর ভিড় লক্ষ করা গেছে। কয়েকটি ট্রেন ইঞ্জিন সংকটের কারণে নির্ধারিত সময়ের পরে ছেড়ে গেছে।
প্রসঙ্গত, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে সরকার নির্বাহী আদেশে তিন দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে। ওই আদেশ অনুযায়ী ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী সরকারি ছুটি থাকবে এবং শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য ১০ ফেব্রুয়ারি বিশেষ ছুটি বহাল থাকবে।
চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলা ও ৩৪টি থানা এলাকা নিয়ে ১৬টি আসন। এসব আসনে ২৫টি দলের ১১৫ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জেলাজুড়ে বিএনপি প্রতিটি আসনেই ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী দিয়েছে ১৩টি আসনে এবং বাকি ৩টি আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে জোটসঙ্গীদের। যদিও চট্টগ্রাম–৮ আসনে জোটসঙ্গীর পাশাপাশি জামায়াত প্রার্থীও ভোটে থাকায় সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হওয়ার আভাস মিলছে।
চট্টগ্রাম জেলার ১৬ আসনে এবার মোট ভোটার ৬৬ লাখ ১৬ হাজার ৭১২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৩৪ লাখ ৩৬ হাজার ৬৮৫ জন এবং নারী ৩১ লাখ ৭৯ হাজার ৯৫৮ জন। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন ৭০ জন। এসব ভোটারের মধ্যে নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছে তিন লাখ চার হাজার ৫১ জন। যাদের অধিকাংশই তরুণ।