সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য

র‌্যাব-ডিজিএফআই বিলুপ্ত চান সাবেক সেনাপ্রধান

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ : ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:১৩

দ্বিতীয় দিনের জবানবন্দিতে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেছেন, ‘অনেকেই ভাবছেন, আমি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। এ ব্যাপারে আমার ব্যাখ্যা হচ্ছে, আমরা যতই অস্বীকার করার চেষ্টা করি না কেন, সেনাবাহিনী কলুষিত হয়েছে। আমাদের উচিত হবে না আমাদের আত্মশুদ্ধির যে সুযোগ এসেছে, তা কোনো অবস্থাতেই হেলায় হারানো।’

আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে শতাধিক মানুষকে গুম ও খুনের ঘটনায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে সোমবার দ্বিতীয় দিনের মতো জবানবন্দিতে সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া এ কথাগুলো বলেন। এর আগে গতকাল রোববার তিনি জবানবন্দি দেন।

সাবেক এই সেনাপ্রধান জবানবন্দিতে আরও বলেন, ‘আমি চাই র‍্যাব অবিলম্বে বিলুপ্ত করা দরকার এবং সেটি সম্ভব না হলে সামরিক সদস্যদের সামরিক বাহিনীতে ফিরিয়ে আনা উচিত। আমি আরও চাই ডিজিএফআইও বিলুপ্ত করা হোক। কারণ, এই সংগঠনটি আয়নাঘরের মতো অপসংস্কৃতি জন্ম দেওয়ার পরে টিকে থাকার বৈধতা হারিয়েছে।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ এই মামলার জবানবন্দি নেওয়া হচ্ছে। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল–১ এর অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

এ মামলার একমাত্র আসামি সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান। তিনি গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। তাঁকে আজ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

আজকের জবানবন্দিতে সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘এত কিছুর পরও যখন বুঝতে পারি ক্রসফায়ার থামছে না, তখন আমি ডিজিএফআই, বিজিবি এবং র‍্যাব থেকে অফিসার নিয়ে আসা ও পোস্টিং বন্ধ করে দিই। আমাকে অনেকে মনে করিয়ে দেন যে আমি যা করছি, তা বিদ্রোহের শামিল। আমার উত্তর একটাই ছিল যে হাশরের ময়দানে আমাকে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে। পোস্টিং বন্ধ করার প্রতিক্রিয়াও ছিল মারাত্মক। আমি প্রতিনিয়ত অফিসার পোস্টিং করার জন্য টেলিফোন পেতে থাকি। একসময় র‍্যাবের ডিজি বেনজীর আহমেদ আমার অফিসে আসেন এবং র‍্যাব অফিসার দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান। তাঁকে কোনো কথা দিইনি।’

সাবেক এই সেনাপ্রধান জবানবন্দিতে আরও বলেন, ‘চট্টগ্রামে হোটেল র‍্যাডিসন উদ্বোধনের সময় তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈঠককালে আমাকে ডেকে নেন এবং র‍্যাব অফিসার দিতে বলেন। এই স্বল্পতার কারণে র‍্যাবে অফিসার দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানাই। আমার অবসর গ্রহণের আগপর্যন্ত এই চাপ অব্যাহত ছিল। কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম।’

সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া আরও বলেন, ‘র‍্যাবের কর্মকাণ্ডের কারণে আমার দায়িত্বকালীন সময়টি ছিল অত্যন্ত কষ্টদায়ক। কিছু করতে না পারার বেদনা আমাকে সব সময় আচ্ছন্ন করে রাখত। আজ সুযোগ এসেছে সেই করতে না পারার কাজটি সম্পন্ন করার। এতে সেনাবাহিনীর গৌরব ক্ষুণ্ণ হবে না, বরং সেনাবাহিনী গৌরবের উচ্চ শিখরে আসীন হবে। পুরো জাতি জানবে সেনাবাহিনী কখনো দোষী ব্যক্তিদের ছাড় দেয় না। এতে সেনাবাহিনীর গৌরব এবং সম্মানের সাইনবোর্ডের আড়ালে অফিসারদের অপকর্ম করে পার পেয়ে যাওয়ার প্রবৃত্তি দূর হবে।’

আজকে সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জবানবন্দি শেষ হয়। পরে তাঁকে জেরা করা শুরু করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল গনি। জেরায় এক প্রশ্নের জবাবে সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি একজন ডিহিউম্যানাইজড সেনা কর্মকর্তা। আমি আমার চাকরিজীবনের ৪০ বছরে শিখেছি কীভাবে মানুষ হত্যা করতে হয়। শুধু আমি নই, পৃথিবীর সব সেনাসদস্যকে এই একই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।’

ভিডিও