রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

চবিতে সাংবাদিককে পাহাড়ে নিয়ে মারার হুমকি ছাত্রদল নেতার

চবি প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:২২

সংবাদ প্রকাশের জেরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) সাংবাদিককে হল থেকে টেনে নিয়ে পাহাড়ে উঠিয়ে মারার হুমকির অভিযোগ উঠেছে এক ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে। সোমবার (২৬ জানুয়ারি) দিবাগত রাত সোয়া ১২টার দিকে হোয়াটসঅ্যাপে কল দিয়ে এ হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিক।

ভুক্তভোগী সাংবাদিকের নাম এম মিজানুর রহমান। তিনি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি এবং বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (চবিসাস) সদস্য। অপরদিকে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর নাম মো. সিফাতুল ইসলাম। তিনি যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক।

এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ফোনালাপের একটি অডিও রেকর্ড ইতোমধ্যে প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। অডিও রেকর্ডে শুনা যায়, হুমকিদাতা নিজেকে ‘সালমান (আব্দুস সালাম সালমান)’ পরিচয় দিয়ে সাংবাদিককে উদ্দেশ্য করে অশ্রাব্য ভাষায় মারধরের হুমকি দেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আপনি যে নিউজ করলেন, আপনাকে এটার অনুমতি দিলো কে? … একেবারে ভাইঙ্গা দিমু। ফরহাদ হল থেইকা টাইন্না নিয়া নীড়া পাহাড়ে উডামু। এমন কোনো … নাই যে আপনারে ঠেকাইবে।’

তবে, সাংবাদিককে হুমকি প্রদানের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সালমান বলেন, ‘আমি হুমকি দেইনি। বিষয়টি সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না।’ এরপর তিনি একটি অনুষ্ঠানে আছেন উল্লেখ করে কল কেটে দেন।

তবে যে নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে কল এসেছিল সেই নম্বরে পুনরায় যোগাযোগ করলে কলটি রিসিভ করেন অভিযুক্ত মো. সিফাতুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমি সাংবাদিকতা ডিপার্টমেন্টের ছাত্র। আমারে সাংবাদিকতা শিখাইলে হবে না। তার (সালমানের) অনুমতি ছাড়া কীভাবে একটা নিউজ করে? ওর বিরুদ্ধে বারবার নিউজ হইছে। এখন ওর তো মাথা গরম হইয়া গেছে।’

সংবাদে কোনো ভুল তথ্য ছিল কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নিউজটাতে মোটামুটি তথ্য গ্যাপ আছে। এই যে নিউজে বললো, হলে বসে মদ পান করছে। এগুলো ওরা কক্সবাজার গিয়া একবার করছিল। ও মদ-টদ কিছু খায় না, শুধু সিগারেট খায়। তাও এখন হলে আর খায় না।’

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী সাংবাদিক এম. মিজানুর রহমান বলেন, ‘সালমান দীর্ঘদিন ধরে শহীদ ফরহাদ হোসেন হলে অবৈধভাবে অবস্থান করছিলেন। বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর গতকাল রাত সোয়া ১২টার দিকে সালমানের বন্ধু মো. সিফাতুল ইসলাম নিজেকে ‘সালমান’ পরিচয় দিয়ে আমার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে কল করে আমাকে হল থেকে টেনে পাহাড়ে নিয়ে গিয়ে মারার হুমকি দেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘সংবাদের কোনো অংশে অসত্য থাকলে সংশোধনের অনুরোধ, প্রতিবাদলিপি প্রেরণ কিংবা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু একজন সাংবাদিককে এভাবে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর ভয়াবহ আক্রমণ। এতে আমি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। ইতোমধ্যেই আমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অফিসে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।’

এদিকে ছাত্রদল সূত্রে জানা গেছে, হলে অবৈধভাবে অবস্থান করা সালমান শাখা ছাত্রদলের সভাপতি আলাউদ্দিন মহসিনের অনুসারী হিসেবে ক্যাম্পাসে পরিচিত। তিনি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক দিনাজপুর–২ আসনে বিএনপির আসনভিত্তিক সমন্বয় কমিটির সদস্য বলেও নিশ্চিত হওয়া গেছে।

শহীদ ফরহাদ হোসেন হলে অবৈধভাবে অবস্থান করায় হল প্রশাসন কর্তৃক ইতোপূর্বে একাধিকবার হলত্যাগের নোটিশ দেওয়া হলেও সালমান তা উপেক্ষা করেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে। অভিযুক্ত মো. সিফাতুল ইসলাম সালমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, সালমানকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদের জেরে সিফাত নিজেই সালমান সেজে সাংবাদিককে ফোন করে এই হুমকি দিয়েছেন। হুমকির বিষয়ে জানতে চাইলে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি আলাউদ্দিন মহসিন বলেন, ‘বিষয়টি আমি দেখতেছি।’

পেশাগত দায়িত্ব পালনের জেরে সাংবাদিককে সরাসরি হুমকি প্রদানের বিষয়ে চবি সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজ শুভ্র বলেন, ‘একজন সাংবাদিককে সরাসরি হুমকি দেওয়া ফৌজদারি অপরাধ। গণমাধ্যমকর্মীদের কণ্ঠরোধ করার যেকোনো অপচেষ্টা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবিলম্বে দোষীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে আমরা হুমকিপ্রাপ্ত সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী বলেন, ‘একজন সাংবাদিক আমাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। একটি সংবাদের জেরে একজন শিক্ষার্থী তাকে শারীরিকভাবে মারার হুমকি দিয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মহোদয়কে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের আহ্বান জানিয়েছি। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ভিডিও